তফসিল ঘোষণার পরপরই ইনকিলাব মঞ্চের মুখপাত্র শরীফ ওসমান হাদির ওপর পেশাদার কিলার টিমের হামলা, ‘র’-এর সংশ্লিষ্টতা নিয়ে গোয়েন্দা সন্দেহ
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার একদিনের মাথায় ‘ইনকিলাব মঞ্চ’-এর মুখপাত্র ও ঢাকা-৮ আসনের সম্ভাব্য স্বতন্ত্র প্রার্থী শরীফ ওসমান হাদিকে গুলি করে হত্যার চেষ্টা করা হয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে ভারতীয় আগ্রাসন ও আওয়ামী লীগের দেশবিরোধী কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে সোচ্চার অবস্থানের কারণে তিনি দেশ-বিদেশি শক্তির টার্গেটে পরিণত হয়েছিলেন বলে মনে করছে নিরাপত্তা ও গোয়েন্দা সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্র।
হামলার ধরন, সময় নির্বাচন এবং পরবর্তী তথ্যপ্রমাণ বিশ্লেষণ করে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর দায়িত্বশীল সূত্রগুলো এটিকে কোনো বিচ্ছিন্ন অপরাধ নয়, বরং একটি সুপরিকল্পিত রাজনৈতিক হত্যাচেষ্টা হিসেবে দেখছে। তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, এ ঘটনার পেছনে ভারত ও তাদের মদতপুষ্ট দেশীয় চক্রের সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনার বাস্তবায়ন ঘটতে পারে। এমনকি ভারতীয় গোয়েন্দা সংস্থা ‘র’ (রিসার্চ অ্যান্ড অ্যানালাইসিস উইং)-এর প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ সংশ্লিষ্টতার বিষয়টিও গুরুত্বের সঙ্গে খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
রাজনৈতিক প্রতিহিংসা ও বিদেশি চক্রান্তের অভিযোগ
তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর দাবি, শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর অন্তর্বর্তী সরকার ভারতের সঙ্গে সম্পাদিত একাধিক বিতর্কিত চুক্তি পুনর্বিবেচনা এবং সীমান্তে ‘দাদাগিরি’ বন্ধে যেসব উদ্যোগ নিয়েছে, তাতে দিল্লি অসন্তুষ্ট। সেই প্রেক্ষাপটে ভারতবিরোধী অবস্থানের কারণে তরুণ প্রজন্মের কাছে ‘প্রতিবাদের আইকন’ হয়ে ওঠা হাদিকে সরিয়ে দেওয়াই ছিল এই পরিকল্পনার অন্যতম লক্ষ্য।
ধানমন্ডি ৩২ নম্বরের বাড়ি ভাঙা, ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে অবস্থান এবং শেখ হাসিনার বিচারের দাবির মতো সংবেদনশীল ইস্যুতে সরব থাকায় তিনি ভারত ও তাদের দেশীয় মিত্রদের প্রধান টার্গেটে পরিণত হন বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
পেশাদার কিলার টিম ও ‘র’-এর ছায়া
ঘটনাস্থল থেকে উদ্ধার করা গুলির শেল ও সিসিটিভি ফুটেজ বিশ্লেষণ করে তদন্তকারীরা বলছেন, হামলাটি কোনো সাধারণ সন্ত্রাসীর কাজ নয়। এটি ছিল প্রশিক্ষিত, পেশাদার একটি কিলার টিমের অপারেশন—যারা টার্গেট নির্বাচন, হামলা ও দ্রুত পালিয়ে যাওয়ার কৌশলে পারদর্শী। প্রাথমিক তদন্তে উঠে এসেছে, এই টিমের প্রশিক্ষণ, লজিস্টিক সাপোর্ট ও নির্দেশনা বিদেশি গোয়েন্দা নেটওয়ার্ক থেকে আসতে পারে।
নির্বাচনকে অস্থিতিশীল করা, সরকারকে চরম চাপে ফেলা এবং দেশে সহিংস পরিস্থিতি তৈরি করাই এই অপারেশনের দীর্ঘমেয়াদি লক্ষ্য বলে মনে করছেন গোয়েন্দারা।
অনুপ্রবেশ, আন্ডারওয়ার্ল্ড ও অস্থিতিশীলতার নকশা
গোয়েন্দা তথ্যে জানা গেছে, নির্বাচন বানচালের বৃহত্তর ষড়যন্ত্রের অংশ হিসেবে গত কয়েক মাসে ভারতীয় সীমান্ত দিয়ে প্রায় ৮০ জন প্রশিক্ষিত আততায়ী বাংলাদেশে অনুপ্রবেশ করেছে—এমন আলোচনা নিরাপত্তা মহলে বেশ জোরালো। এই তালিকায় শীর্ষ সন্ত্রাসী সুব্রত বাইনসহ একাধিক আন্ডারওয়ার্ল্ড ফিগারের নাম উঠে এসেছে।
তদন্তকারীরা খতিয়ে দেখছেন, পশ্চিমবঙ্গ পুলিশের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা, কারাবন্দি সুব্রত বাইন, জামিনে থাকা পিচ্চি হেলাল এবং চরমপন্থি সংগঠন গণমুক্তি ফৌজের প্রধান মুকুলের মধ্যে যোগাযোগের সূত্র। অভিযোগ রয়েছে, এসব চক্র সমন্বিতভাবে সহিংসতা ছড়িয়ে নির্বাচন ব্যাহত করার ছক কষেছে। হাদির ওপর হামলাকে সেই ষড়যন্ত্রের ‘প্রথম ধাপ’ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
রহস্যজনক গতিবিধি ও ভাইরাল অডিও
হামলার আগে-পরে কিছু সন্দেহজনক গতিবিধি তদন্তকারীদের উদ্বিগ্ন করেছে। সিসিটিভি ফুটেজে দেখা যায়, হামলার আগে দুই তরুণ দীর্ঘ সময় ধরে হাদির আশপাশে ঘোরাফেরা করছিল। তাদের ভূমিকা এখন খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
এদিকে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হওয়া একটি অডিও ক্লিপ নতুন মাত্রা যোগ করেছে। সেখানে শেখ হাসিনা ও এক সন্ত্রাসীর কথোপকথনে ‘জুলাই বীরদের খুন’ করার উসকানির অভিযোগ উঠেছে। হাদির সমর্থকদের দাবি, এই উসকানির বাস্তব প্রতিফলনই হলো তার ওপর হামলা। ফোনালাপের অপর প্রান্তের ব্যক্তির পরিচয় দ্রুত শনাক্তের দাবি উঠেছে।
আগাম হত্যার হুমকি
গুলিবিদ্ধ হওয়ার প্রায় এক মাস আগে, ১৪ নভেম্বর, হাদি নিজেই ফেসবুকে জানিয়েছিলেন—তিনি ও তার পরিবার অন্তত ৩০টি বিদেশি নম্বর থেকে হত্যা, ধর্ষণ ও অগ্নিসংযোগের হুমকি পাচ্ছেন। তখন তিনি লিখেছিলেন,
‘এক হাদিকে হত্যা করলে আল্লাহ এই জমিনে লক্ষ হাদি তৈরি করবেন।’
সামনে আরও টার্গেট?
নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের আশঙ্কা, জনপ্রিয় প্রার্থী, রাজনৈতিক নেতা ও বুদ্ধিজীবীদের লক্ষ্য করে ধারাবাহিক হামলার মাধ্যমে দেশকে চরম অস্থিতিশীলতার দিকে ঠেলে দেওয়ার একটি সুসংগঠিত পরিকল্পনা সক্রিয় রয়েছে। তবে আগাম গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে নিরাপত্তা বাহিনী সর্বোচ্চ সতর্ক অবস্থানে রয়েছে এবং এই নেটওয়ার্কের মূল হোতাদের শনাক্তে জোরালো অভিযান শুরু হয়েছে।






















