ঢাকা ১২:৫২ পূর্বাহ্ন, শনিবার, ১৮ এপ্রিল ২০২৬, ৪ বৈশাখ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

যুক্তরাষ্ট্রকে চাপে ফেলতে ইউরোপের ঘনিষ্ঠ হওয়ার চেষ্টা করছে ইরান

  • ডেস্ক রিপোর্টঃ
  • আপডেট সময় ১১:৫০:০৬ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ১৫ এপ্রিল ২০২৬
  • ৫২০ বার পড়া হয়েছে

এবার যুক্তরাষ্ট্রের ওপর চাপ বাড়াতে কূটনৈতিক তৎপরতা জোরদার করেছে ইরান। ইউরোপকে কাছে টানার চেষ্টা, হরমুজ প্রণালি নিয়ে নতুন প্রস্তাব এবং পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে অবস্থান, সব মিলিয়ে জটিল এক কূটনৈতিক সমীকরণ তৈরি হয়েছে। একই সময়ে যুক্তরাষ্ট্রইউরোপ সম্পর্কেও বাড়ছে ফাটল। আর এটি চলমান পরিস্থিতিকে আরও সংবেদনশীল করে তুলেছে। সংবাদমাধ্যম দ্য গার্ডিয়ান বলছে, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে চলমান বিরোধে সমঝোতার জন্য চাপ বাড়াতে ইউরোপকে কাছে টানার চেষ্টা করছে ইরান। এ লক্ষ্যে দেশটির পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি ইসলামাবাদে অনুষ্ঠিত সাম্প্রতিক আলোচনায় উচ্চমাত্রায় সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের মজুত এবং হরমুজ প্রণালির ভবিষ্যৎ ব্যবস্থাপনা নিয়ে ইরান যে প্রস্তাব দিয়েছিল তা ইউরোপীয় দেশগুলোকেও অবহিত করেছেন।

ইসলামাবাদের ওই আলোচনার পর ফ্রান্স ও জার্মানির পররাষ্ট্রমন্ত্রী জ্যঁনোয়েল বারো এবং ইয়োহান ভাডেফুলের সঙ্গে ফোনে কথা বলেন আরাগচি। পাশাপাশি সৌদি আরব, ওমান ও কাতারের পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের সঙ্গেও তিনি যোগাযোগ করেন। জানা গেছে, তিনি জোর দিয়ে বলেছেন২১ ঘণ্টার টানা আলোচনার পরও পাকিস্তাননেতৃত্বাধীন এই প্রক্রিয়া শেষ হয়ে গেছে বলে মনে করছে না ইরান। দ্য গার্ডিয়ান বলছে, এক বছরের বেশি সময় ধরে ইরান ইস্যুতে ইউরোপকে পাশ কাটিয়ে ইসরায়েলের সঙ্গে কাজ করে আসছেন ডোনাল্ড ট্রাম্প। অন্যদিকে তেহরানও ইউরোপীয় সরকারগুলোকে প্রায়ই যুক্তরাষ্ট্রের অনুসারী হিসেবে দেখেছে। তবে যুক্তরাষ্ট্রইউরোপ সম্পর্কের বাড়তে থাকা টানাপোড়েন এবং ইউরোপীয় অর্থনীতির ওপর বাড়তি চাপ ইরানকে তার অবস্থান নতুন করে ভাবতে বাধ্য করেছে। এখন ট্রাম্পের ওপর চাপ তৈরির সম্ভাব্য মাধ্যম হিসেবে ইউরোপকে বিবেচনা করছে তেহরান।

ইউরোপীয় দেশগুলো ট্রাম্পের সামরিক সহায়তার দাবির প্রেক্ষিতে একটি প্রতিরক্ষামূলক, যুদ্ধমুখী নয় এমন নৌজোট গঠনের দিকে মনোযোগ দিয়েছে। আর এর লক্ষ্য হরমুজ প্রণালিতে নৌ চলাচলের স্বাধীনতা নিশ্চিত করা। তবে এই উদ্যোগ কার্যকর হবে সংঘাত শেষ হওয়ার পর। পরিকল্পনাটি বাস্তবায়নে সূক্ষ্ম আলোচনা প্রয়োজন। আর তা লোহিত সাগরে হুতিদের মোকাবিলায়অপারেশন অ্যাসপিডেস’-এর অভিজ্ঞতা থেকে নেয়া হতে পারে। ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রোঁ এই প্রস্তাব নিয়ে মিত্রদের সঙ্গে আলোচনা করতে ব্রিটেনের সঙ্গে যৌথ সম্মেলনের ঘোষণা দিয়েছেন। এটি এই উদ্যোগের তৃতীয় বৈঠক। যে কোনও পরিকল্পনার জন্য তেহরানের সঙ্গে আলোচনা জরুরি হবে। যার মধ্যে হরমুজ প্রণালিতে টোল আরোপের বিষয়টিও রয়েছে। কুইন্সি ইনস্টিটিউটের পরিচালক ত্রিতা পারসি বলেন, ‘ইরান চেষ্টা করবে ইউরোপকে নিজেদের অবস্থানের দিকে কিছুটা হলেও টানতে। যদি তা সম্ভব না হয়, তাহলে ইউরোপের ভেতর আরও বড় বিভাজন তৈরি করা যায় কি না, সেটিও তারা দেখবেযেখানে সব দেশ জার্মানি, ফ্রান্স বা যুক্তরাজ্যের অবস্থান অনুসরণ করবে না।

তিনি আরও বলেন, ‘ইরান দ্রুত একটি প্রক্রিয়া চালু করতে চাইছে, যেখানে তুলনামূলক কম টোল নির্ধারণ করে যত বেশি সম্ভব দেশকে এতে যুক্ত করা যায়।এছাড়া স্বল্পমেয়াদে ইরান মাইন অপসারণে সক্ষম দেশগুলো অর্থাৎ জার্মানি, যুক্তরাজ্য ও ইতালিকে ওয়াশিংটনের চাপ উপেক্ষা করতে বলবে। কারণ তেহরান মনে করে, হরমুজ প্রণালিতে মাইন অপসারণ শুরু করা হলে তা ইরানের তেলবন্দর অবরোধে ট্রাম্পের পদক্ষেপকে সমর্থন করার শামিল হবে। অধিকাংশ মাইন মানচিত্রে চিহ্নিত না থাকায় শান্তিপূর্ণ পরিবেশেও এগুলো অপসারণ ঝুঁকিপূর্ণ, আর ইরানি ড্রোন হামলার মধ্যে এই কাজ হলে তা আরও বিপজ্জনক হয়ে উঠবে। ব্রিটিশ মন্ত্রীরা জানিয়েছেন, ফ্রান্সব্রিটেন সম্মেলনে ইরানি মাইনের বিষয়টি আলোচনায় আসবে।

ইতালির ক্ষেত্রে পরিস্থিতি আরও জটিল। পোপকে নিয়ে ট্রাম্পের মন্তব্য এবং হাঙ্গেরিতে ভিক্টর অরবানের পরাজয়ের পর ইতালির ডানপন্থি প্রধানমন্ত্রী জর্জিয়া মেলোনির জন্য যুক্তরাষ্ট্রের চাপ মেনে নেয়া রাজনৈতিকভাবে কঠিন হয়ে উঠেছে। ট্রাম্পের সঙ্গে তার ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক ও ইসরায়েলের প্রতি সমর্থনও এখন চাপে পড়েছে। ফরাসিব্রিটিশ উদ্যোগ নিয়ে এখনও চূড়ান্ত কোনও মত দেয়নি তেহরান। কারণ এই পরিকল্পনায় কী কী থাকবে তা এখনও স্পষ্ট নয়। বিশেষ করে কোন জাহাজকে টোল দিতে হবে, কোন আইনি ভিত্তিতে, কত হারে বা কোন মুদ্রায় এসব বিষয় এখনও অনির্ধারিত। ইরানের পার্লামেন্টে একটি বিলে প্রস্তাব করা হয়েছে, নতুন টোল শুধু তেলবাহী জাহাজ নয়, সব ধরনের বাণিজ্যিক জাহাজের ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য হবে। যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞা এড়াতে দেশটি ক্রিপ্টোকারেন্সিতে অর্থ গ্রহণের কথাও বিবেচনা করতে পারে। হরমুজ প্রণালি দিয়ে বৈশ্বিক সমুদ্র বাণিজ্যের প্রায় ১১ শতাংশ এবং সমুদ্রপথে পরিবাহিত তেলের একতৃতীয়াংশ চলাচল করে।

ম্যালি বলেন, টোল ব্যবস্থা টেকসই হবে না বলে তার মনে হয়। তবে তিনি আরও বলেন, ‘ইরান একটি নতুন প্রতিরোধ কৌশল আবিষ্কার করেছে, যা পারমাণবিক অস্ত্র অর্জনের চেয়েও কার্যকরতা হলো হরমুজ প্রণালি বন্ধ করে দেয়া অন্যদিকে যুক্তরাজ্য বলেছে, নৌ চলাচলের স্বাধীনতা মানে এটি উন্মুক্তই থাকতে হবে। গত বছর ই৩ দেশ অর্থাৎ ফ্রান্স, জার্মানি ও যুক্তরাজ্য ইরানের পারমাণবিক স্থাপনায় প্রবেশাধিকার নিয়ে প্রতিশ্রুতি পূরণ না করার অভিযোগে জাতিসংঘের নিষেধাজ্ঞা পুনর্বহাল করতে সম্মতি দেয়ায় ইউরোপের সমালোচনা করেছিলেন আরাগচি। তবে মধ্যপ্রাচ্য ইস্যুতে ট্রাম্প ও ইউরোপের মধ্যে ক্রমবর্ধমান দূরত্ব ইরান নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছে। এর মধ্যে রয়েছে ন্যাটোর প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের অঙ্গীকার এবং ইসরায়েলকে যুদ্ধবিরতিতে বাধ্য করার প্রশ্ন। কারণ দক্ষিণ লেবাননে হিজবুল্লাহর ওপর হামলা বন্ধ করার দাবিও করে আসছে ইরান।

মূলত হিজবুল্লাহকে রক্ষার দায়বদ্ধতা অনুভব করে থাকে ইরান। ইউরোপীয় কমিশনের প্রেসিডেন্ট উরসুলা ফন ডার লিয়েন বলেছেন, লেবাননের যুদ্ধকে যেকোনও যুদ্ধবিরতি আলোচনার অন্তর্ভুক্ত করা জরুরি। তিনি জানান, এই সংকটে জ্বালানি খাতে অতিরিক্ত ব্যয়ে প্রায় ২২ বিলিয়ন ইউরো ক্ষতি হচ্ছে। ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে দেশটির শীর্ষ কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, তারা সদিচ্ছার প্রমাণ হিসেবে উচ্চমাত্রায় সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের মজুত হস্তান্তর নয়, বরং তা পাতলা (ডাইলিউট) করতে প্রস্তুত ছিলেন। পার্লামেন্টের ডেপুটিস্পিকার আলি নিকজাদ বলেন, ‘সদিচ্ছা দেখাতে ইরান ৪৫০ কেজি সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম হস্তান্তর নয়, বরং পাতলা করতে প্রস্তুত রয়েছে।তিনি আরও বলেন, ‘ইরান, যুক্তরাষ্ট্র ও সৌদি আরবের অংশগ্রহণে একটি কনসোর্টিয়াম গঠনের কথাও ছিল, কিন্তু তারা সেই চুক্তি থেকে সরে আসে।

তবে ইউরোপীয় কূটনীতিকরা বলছেন, ইরানকে কীভাবে পারমাণবিক কর্মসূচিতে ছাড় দিতে রাজি করানো যাবে, তা এখনও ধাঁধার মতো। কারণ যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার যে স্থায়ীভিত্তিতে হবে, এমন নিশ্চয়তা নেই। কেউ কেউ মনে করেন, যদি যুক্তরাষ্ট্র প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করে তাহলে হরমুজ প্রণালিকে বৈধ আয়ের উৎস বা ক্ষতিপূরণ হিসেবে প্রস্তাব করা যেতে পারে। চ্যাথাম হাউসের আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা কর্মসূচির সদস্য নিত্যা লাভ বলেন, প্রণালিকে ঘিরে নতুন একটি কাঠামো গড়ে তোলা প্রয়োজন হতে পারে। তার মতে, ‘এই প্রণালি নিয়ে যেকোনও চুক্তিতে ইরানকে অবশ্যই অন্তর্ভুক্ত করতে হবে।তিনি লিখেছেন, এর জন্য কাঠামোবদ্ধ নিষেধাজ্ঞা শিথিলকরণ ও প্রণালির ব্যবস্থাপনা দরকার হবে। ইরানসহ আঞ্চলিক অংশীদারদের অংশগ্রহণে জাহাজ চলাচল যাচাই ও নৌ নিরাপত্তা ব্যবস্থা গড়ে তোলা সম্ভব। তবে তিনি স্বীকার করেন, এটি দ্রুত সমাধান নয়, বরং দীর্ঘমেয়াদে স্থিতিশীলতার ভিত্তি।

লাভ বলেন, ‘ভবিষ্যৎ কোনও চুক্তিতে শুধু পারমাণবিক সীমাবদ্ধতাই নয়, এর বিনিময়ে ইরান কী রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সুবিধা পাবে, সেটিও স্পষ্টভাবে নির্ধারণ করতে হবে এবং তা এমনভাবে করতে হবে, যাতে সব পক্ষের ভেতরেই সমর্থন পাওয়া যায়।সার্বিকভাবে ইউরোপে ট্রাম্পের বিরুদ্ধে আরও দৃঢ় অবস্থান নেয়ার প্রবণতা ক্রমেই বাড়ছে, যদিও এতে ইউক্রেন ইস্যুতে তাদের করা বড় সমঝোতা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার ঝুঁকি রয়েছে। কার্নেগি এনডাউমেন্ট ফর ইন্টারন্যাশনাল পিসের সিনিয়র ফেলো সোফিয়া বেসচ বলেন, ইরান ইস্যুতে যুক্তরাষ্ট্রের পদক্ষেপের সমালোচনায় ইউরোপের আরও সক্রিয় হওয়া উচিত। তিনি বলেন, ‘আমরা যদি ইউরোপের পুনরায় সশস্ত্র হওয়ার বিষয়ে জনসমর্থন ধরে রাখতে চাই, তাহলে একতরফা যুদ্ধ বা সামরিক অভিযানে যুক্তরাষ্ট্রকে অন্ধভাবে অনুসরণ করা যাবে না।

জনপ্রিয় সংবাদ

সাবেক আইআরজিসি প্রধান কেন চান যুক্তরাষ্ট্র ইরানে ‘স্থল আক্রমণ’ চালাক

যুক্তরাষ্ট্রকে চাপে ফেলতে ইউরোপের ঘনিষ্ঠ হওয়ার চেষ্টা করছে ইরান

আপডেট সময় ১১:৫০:০৬ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ১৫ এপ্রিল ২০২৬

এবার যুক্তরাষ্ট্রের ওপর চাপ বাড়াতে কূটনৈতিক তৎপরতা জোরদার করেছে ইরান। ইউরোপকে কাছে টানার চেষ্টা, হরমুজ প্রণালি নিয়ে নতুন প্রস্তাব এবং পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে অবস্থান, সব মিলিয়ে জটিল এক কূটনৈতিক সমীকরণ তৈরি হয়েছে। একই সময়ে যুক্তরাষ্ট্রইউরোপ সম্পর্কেও বাড়ছে ফাটল। আর এটি চলমান পরিস্থিতিকে আরও সংবেদনশীল করে তুলেছে। সংবাদমাধ্যম দ্য গার্ডিয়ান বলছে, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে চলমান বিরোধে সমঝোতার জন্য চাপ বাড়াতে ইউরোপকে কাছে টানার চেষ্টা করছে ইরান। এ লক্ষ্যে দেশটির পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি ইসলামাবাদে অনুষ্ঠিত সাম্প্রতিক আলোচনায় উচ্চমাত্রায় সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের মজুত এবং হরমুজ প্রণালির ভবিষ্যৎ ব্যবস্থাপনা নিয়ে ইরান যে প্রস্তাব দিয়েছিল তা ইউরোপীয় দেশগুলোকেও অবহিত করেছেন।

ইসলামাবাদের ওই আলোচনার পর ফ্রান্স ও জার্মানির পররাষ্ট্রমন্ত্রী জ্যঁনোয়েল বারো এবং ইয়োহান ভাডেফুলের সঙ্গে ফোনে কথা বলেন আরাগচি। পাশাপাশি সৌদি আরব, ওমান ও কাতারের পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের সঙ্গেও তিনি যোগাযোগ করেন। জানা গেছে, তিনি জোর দিয়ে বলেছেন২১ ঘণ্টার টানা আলোচনার পরও পাকিস্তাননেতৃত্বাধীন এই প্রক্রিয়া শেষ হয়ে গেছে বলে মনে করছে না ইরান। দ্য গার্ডিয়ান বলছে, এক বছরের বেশি সময় ধরে ইরান ইস্যুতে ইউরোপকে পাশ কাটিয়ে ইসরায়েলের সঙ্গে কাজ করে আসছেন ডোনাল্ড ট্রাম্প। অন্যদিকে তেহরানও ইউরোপীয় সরকারগুলোকে প্রায়ই যুক্তরাষ্ট্রের অনুসারী হিসেবে দেখেছে। তবে যুক্তরাষ্ট্রইউরোপ সম্পর্কের বাড়তে থাকা টানাপোড়েন এবং ইউরোপীয় অর্থনীতির ওপর বাড়তি চাপ ইরানকে তার অবস্থান নতুন করে ভাবতে বাধ্য করেছে। এখন ট্রাম্পের ওপর চাপ তৈরির সম্ভাব্য মাধ্যম হিসেবে ইউরোপকে বিবেচনা করছে তেহরান।

ইউরোপীয় দেশগুলো ট্রাম্পের সামরিক সহায়তার দাবির প্রেক্ষিতে একটি প্রতিরক্ষামূলক, যুদ্ধমুখী নয় এমন নৌজোট গঠনের দিকে মনোযোগ দিয়েছে। আর এর লক্ষ্য হরমুজ প্রণালিতে নৌ চলাচলের স্বাধীনতা নিশ্চিত করা। তবে এই উদ্যোগ কার্যকর হবে সংঘাত শেষ হওয়ার পর। পরিকল্পনাটি বাস্তবায়নে সূক্ষ্ম আলোচনা প্রয়োজন। আর তা লোহিত সাগরে হুতিদের মোকাবিলায়অপারেশন অ্যাসপিডেস’-এর অভিজ্ঞতা থেকে নেয়া হতে পারে। ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রোঁ এই প্রস্তাব নিয়ে মিত্রদের সঙ্গে আলোচনা করতে ব্রিটেনের সঙ্গে যৌথ সম্মেলনের ঘোষণা দিয়েছেন। এটি এই উদ্যোগের তৃতীয় বৈঠক। যে কোনও পরিকল্পনার জন্য তেহরানের সঙ্গে আলোচনা জরুরি হবে। যার মধ্যে হরমুজ প্রণালিতে টোল আরোপের বিষয়টিও রয়েছে। কুইন্সি ইনস্টিটিউটের পরিচালক ত্রিতা পারসি বলেন, ‘ইরান চেষ্টা করবে ইউরোপকে নিজেদের অবস্থানের দিকে কিছুটা হলেও টানতে। যদি তা সম্ভব না হয়, তাহলে ইউরোপের ভেতর আরও বড় বিভাজন তৈরি করা যায় কি না, সেটিও তারা দেখবেযেখানে সব দেশ জার্মানি, ফ্রান্স বা যুক্তরাজ্যের অবস্থান অনুসরণ করবে না।

তিনি আরও বলেন, ‘ইরান দ্রুত একটি প্রক্রিয়া চালু করতে চাইছে, যেখানে তুলনামূলক কম টোল নির্ধারণ করে যত বেশি সম্ভব দেশকে এতে যুক্ত করা যায়।এছাড়া স্বল্পমেয়াদে ইরান মাইন অপসারণে সক্ষম দেশগুলো অর্থাৎ জার্মানি, যুক্তরাজ্য ও ইতালিকে ওয়াশিংটনের চাপ উপেক্ষা করতে বলবে। কারণ তেহরান মনে করে, হরমুজ প্রণালিতে মাইন অপসারণ শুরু করা হলে তা ইরানের তেলবন্দর অবরোধে ট্রাম্পের পদক্ষেপকে সমর্থন করার শামিল হবে। অধিকাংশ মাইন মানচিত্রে চিহ্নিত না থাকায় শান্তিপূর্ণ পরিবেশেও এগুলো অপসারণ ঝুঁকিপূর্ণ, আর ইরানি ড্রোন হামলার মধ্যে এই কাজ হলে তা আরও বিপজ্জনক হয়ে উঠবে। ব্রিটিশ মন্ত্রীরা জানিয়েছেন, ফ্রান্সব্রিটেন সম্মেলনে ইরানি মাইনের বিষয়টি আলোচনায় আসবে।

ইতালির ক্ষেত্রে পরিস্থিতি আরও জটিল। পোপকে নিয়ে ট্রাম্পের মন্তব্য এবং হাঙ্গেরিতে ভিক্টর অরবানের পরাজয়ের পর ইতালির ডানপন্থি প্রধানমন্ত্রী জর্জিয়া মেলোনির জন্য যুক্তরাষ্ট্রের চাপ মেনে নেয়া রাজনৈতিকভাবে কঠিন হয়ে উঠেছে। ট্রাম্পের সঙ্গে তার ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক ও ইসরায়েলের প্রতি সমর্থনও এখন চাপে পড়েছে। ফরাসিব্রিটিশ উদ্যোগ নিয়ে এখনও চূড়ান্ত কোনও মত দেয়নি তেহরান। কারণ এই পরিকল্পনায় কী কী থাকবে তা এখনও স্পষ্ট নয়। বিশেষ করে কোন জাহাজকে টোল দিতে হবে, কোন আইনি ভিত্তিতে, কত হারে বা কোন মুদ্রায় এসব বিষয় এখনও অনির্ধারিত। ইরানের পার্লামেন্টে একটি বিলে প্রস্তাব করা হয়েছে, নতুন টোল শুধু তেলবাহী জাহাজ নয়, সব ধরনের বাণিজ্যিক জাহাজের ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য হবে। যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞা এড়াতে দেশটি ক্রিপ্টোকারেন্সিতে অর্থ গ্রহণের কথাও বিবেচনা করতে পারে। হরমুজ প্রণালি দিয়ে বৈশ্বিক সমুদ্র বাণিজ্যের প্রায় ১১ শতাংশ এবং সমুদ্রপথে পরিবাহিত তেলের একতৃতীয়াংশ চলাচল করে।

ম্যালি বলেন, টোল ব্যবস্থা টেকসই হবে না বলে তার মনে হয়। তবে তিনি আরও বলেন, ‘ইরান একটি নতুন প্রতিরোধ কৌশল আবিষ্কার করেছে, যা পারমাণবিক অস্ত্র অর্জনের চেয়েও কার্যকরতা হলো হরমুজ প্রণালি বন্ধ করে দেয়া অন্যদিকে যুক্তরাজ্য বলেছে, নৌ চলাচলের স্বাধীনতা মানে এটি উন্মুক্তই থাকতে হবে। গত বছর ই৩ দেশ অর্থাৎ ফ্রান্স, জার্মানি ও যুক্তরাজ্য ইরানের পারমাণবিক স্থাপনায় প্রবেশাধিকার নিয়ে প্রতিশ্রুতি পূরণ না করার অভিযোগে জাতিসংঘের নিষেধাজ্ঞা পুনর্বহাল করতে সম্মতি দেয়ায় ইউরোপের সমালোচনা করেছিলেন আরাগচি। তবে মধ্যপ্রাচ্য ইস্যুতে ট্রাম্প ও ইউরোপের মধ্যে ক্রমবর্ধমান দূরত্ব ইরান নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছে। এর মধ্যে রয়েছে ন্যাটোর প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের অঙ্গীকার এবং ইসরায়েলকে যুদ্ধবিরতিতে বাধ্য করার প্রশ্ন। কারণ দক্ষিণ লেবাননে হিজবুল্লাহর ওপর হামলা বন্ধ করার দাবিও করে আসছে ইরান।

মূলত হিজবুল্লাহকে রক্ষার দায়বদ্ধতা অনুভব করে থাকে ইরান। ইউরোপীয় কমিশনের প্রেসিডেন্ট উরসুলা ফন ডার লিয়েন বলেছেন, লেবাননের যুদ্ধকে যেকোনও যুদ্ধবিরতি আলোচনার অন্তর্ভুক্ত করা জরুরি। তিনি জানান, এই সংকটে জ্বালানি খাতে অতিরিক্ত ব্যয়ে প্রায় ২২ বিলিয়ন ইউরো ক্ষতি হচ্ছে। ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে দেশটির শীর্ষ কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, তারা সদিচ্ছার প্রমাণ হিসেবে উচ্চমাত্রায় সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের মজুত হস্তান্তর নয়, বরং তা পাতলা (ডাইলিউট) করতে প্রস্তুত ছিলেন। পার্লামেন্টের ডেপুটিস্পিকার আলি নিকজাদ বলেন, ‘সদিচ্ছা দেখাতে ইরান ৪৫০ কেজি সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম হস্তান্তর নয়, বরং পাতলা করতে প্রস্তুত রয়েছে।তিনি আরও বলেন, ‘ইরান, যুক্তরাষ্ট্র ও সৌদি আরবের অংশগ্রহণে একটি কনসোর্টিয়াম গঠনের কথাও ছিল, কিন্তু তারা সেই চুক্তি থেকে সরে আসে।

তবে ইউরোপীয় কূটনীতিকরা বলছেন, ইরানকে কীভাবে পারমাণবিক কর্মসূচিতে ছাড় দিতে রাজি করানো যাবে, তা এখনও ধাঁধার মতো। কারণ যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার যে স্থায়ীভিত্তিতে হবে, এমন নিশ্চয়তা নেই। কেউ কেউ মনে করেন, যদি যুক্তরাষ্ট্র প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করে তাহলে হরমুজ প্রণালিকে বৈধ আয়ের উৎস বা ক্ষতিপূরণ হিসেবে প্রস্তাব করা যেতে পারে। চ্যাথাম হাউসের আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা কর্মসূচির সদস্য নিত্যা লাভ বলেন, প্রণালিকে ঘিরে নতুন একটি কাঠামো গড়ে তোলা প্রয়োজন হতে পারে। তার মতে, ‘এই প্রণালি নিয়ে যেকোনও চুক্তিতে ইরানকে অবশ্যই অন্তর্ভুক্ত করতে হবে।তিনি লিখেছেন, এর জন্য কাঠামোবদ্ধ নিষেধাজ্ঞা শিথিলকরণ ও প্রণালির ব্যবস্থাপনা দরকার হবে। ইরানসহ আঞ্চলিক অংশীদারদের অংশগ্রহণে জাহাজ চলাচল যাচাই ও নৌ নিরাপত্তা ব্যবস্থা গড়ে তোলা সম্ভব। তবে তিনি স্বীকার করেন, এটি দ্রুত সমাধান নয়, বরং দীর্ঘমেয়াদে স্থিতিশীলতার ভিত্তি।

লাভ বলেন, ‘ভবিষ্যৎ কোনও চুক্তিতে শুধু পারমাণবিক সীমাবদ্ধতাই নয়, এর বিনিময়ে ইরান কী রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সুবিধা পাবে, সেটিও স্পষ্টভাবে নির্ধারণ করতে হবে এবং তা এমনভাবে করতে হবে, যাতে সব পক্ষের ভেতরেই সমর্থন পাওয়া যায়।সার্বিকভাবে ইউরোপে ট্রাম্পের বিরুদ্ধে আরও দৃঢ় অবস্থান নেয়ার প্রবণতা ক্রমেই বাড়ছে, যদিও এতে ইউক্রেন ইস্যুতে তাদের করা বড় সমঝোতা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার ঝুঁকি রয়েছে। কার্নেগি এনডাউমেন্ট ফর ইন্টারন্যাশনাল পিসের সিনিয়র ফেলো সোফিয়া বেসচ বলেন, ইরান ইস্যুতে যুক্তরাষ্ট্রের পদক্ষেপের সমালোচনায় ইউরোপের আরও সক্রিয় হওয়া উচিত। তিনি বলেন, ‘আমরা যদি ইউরোপের পুনরায় সশস্ত্র হওয়ার বিষয়ে জনসমর্থন ধরে রাখতে চাই, তাহলে একতরফা যুদ্ধ বা সামরিক অভিযানে যুক্তরাষ্ট্রকে অন্ধভাবে অনুসরণ করা যাবে না।