ঢাকা ০৬:৫৮ পূর্বাহ্ন, শনিবার, ১০ জানুয়ারী ২০২৬, ২৭ পৌষ ১৪৩২ বঙ্গাব্দ

চার বছরেও বিচার নেই, অপেক্ষায় ব্রাহ্মণবাড়িয়ার শহীদ পরিবারগুলো

  • ডেস্ক রিপোর্টঃ
  • আপডেট সময় ০৩:২৯:২৭ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ৯ জানুয়ারী ২০২৬
  • ৫২২ বার পড়া হয়েছে

 

ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় ২০২১ সালে মোদিবিরোধী বিক্ষোভে ১৭ মুসল্লিকে গুলি করে হত্যা করেছিল তৎকালীন আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। ওই ঘটনায় গুলিবিদ্ধসহ গুরুতর আহত হন পাঁচ শতাধিক মানুষ। তবে ঘটনার সঙ্গে জড়িত স্থানীয় আওয়ামী লীগের নেতাকর্মী ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা আজও ধরাছোঁয়ার বাইরে রয়ে গেছেন। ঘটনার চার বছর পেরিয়ে গেলেও শহীদ পরিবারগুলো এখন পর্যন্ত ন্যায়বিচার পায়নি।

ঘটনার পরপরই পুলিশ বাদী হয়ে ৫৪টি মামলা দায়ের করেছিল। তবে ওই সব মামলায় আসামি করা হয়েছিল ১০ হাজারের বেশি ধর্মপ্রাণ সাধারণ মানুষ ও আলেমকে। এর জেরে ব্রাহ্মণবাড়িয়াজুড়ে বহু ইমাম-খতিব চাকরিচ্যুত হন এবং অনেককে গ্রেপ্তার করা হয়। জুলাই বিপ্লবের পর অন্তর্বর্তী সরকারের দেড় বছর পার হলেও ওই হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িতদের কেউ এখনো বিচারের মুখোমুখি হয়নি।

২০২১ সালের ২৬ মার্চ বাংলাদেশের ৫১তম স্বাধীনতা দিবসের অনুষ্ঠানে যোগ দিতে শেখ হাসিনার আমন্ত্রণে ঢাকায় আসেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। তার আগমনের প্রতিবাদে সেদিন জুমার নামাজের পর জাতীয় মসজিদ বায়তুল মোকাররম প্রাঙ্গণসহ সারা দেশের মুসল্লিরা প্রতিবাদ জানান। মোদি‍বিরোধী ওই বিক্ষোভে বিনা উসকানিতে ব্রাহ্মণবাড়িয়াসহ সারা দেশে মুসল্লিদের ওপর গুলি চালানো হয়। বাবরি মসজিদ ইস্যুর পাশাপাশি ভারতের সংখ্যালঘু মুসলমানদের ওপর নির্যাতন এবং হিন্দুত্ববাদী দৃষ্টিভঙ্গির জন্য মোদির বাংলাদেশ সফরের বিরোধিতা করে আসছিলেন এ দেশের মানুষ।

 

বিনা উসকানিতে মারা হয় ১৭ মুসল্লিকে

 

২০২১ সালে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নৃশংস ঘটনাটি ছিল দেশের ইতিহাসে অন্যতম বর্বরোচিত হত্যাকাণ্ড। ব্রাহ্মণবাড়িয়ার তৎকালীন আওয়ামী লীগ এমপি ও গৃহায়ন ও গণপূর্তমন্ত্রী র আ ম উবায়দুল মোকতাদির চৌধুরী ছিলেন ওই গণহত্যার নেতৃত্বে। সে সময় নির্বিচারে ১৭ নিরপরাধ ছাত্র-জনতাকে গুলি করে হত্যা করা হয়। আহত ও পঙ্গুত্ববরণ করেন প্রায় ৫০০ মানুষ।

 

ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় সবচেয়ে রক্তাক্ত দিন ছিল ২৭ ও ২৮ মার্চ। ২৬ মার্চ শুরু হয় বিক্ষোভ। তারই ধারাবাহিকতায় ২৭ মার্চ শহরের বিভিন্ন স্থানে পরিকল্পিতভাবে নিরীহ মুসল্লিদের ওপর দফায় দফায় হামলা চালানো হয়। আওয়ামী লীগ, ছাত্রলীগ ও যুবলীগের নেতাকর্মীরা অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে শহরের শতবছরের পুরোনো ঐতিহ্যবাহী কান্দিপাড়ার জামিয়া ইসলামিয়া ইউনুছিয়া মাদরাসা ও জামিয়া সিরাজুল উলুম মাদরাসায় হামলা চালায় । এ সময় আতঙ্কিত মাদরাসাছাত্ররা মসজিদের মাইকে আক্রান্ত হওয়ার খবর প্রচার করেন। এতে স্থানীয় লোকজন এক হয়ে আওয়ামী লীগের ক্যাডারদের ধাওয়া করলে পুলিশ ও হামলাকারীরা মাদরাসাছাত্র ও মুসল্লিদের ওপর গুলি চালায়। এতে ঘটনাস্থলেই আশিকসহ (২০) বেশ কয়েকজন গুলিবিদ্ধ হয়ে মারা যান। আহতদের আহাজারিতে আকাশ-বাতাস ভারী হয়ে ওঠে। পরে মুসল্লিদের বিক্ষোভ শহরের সুহিলপুর, ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক, ভাদুঘর, কুমারশীল মোড়, মেড্ডাসহ বিভিন্ন জায়গায় ছড়িয়ে পড়ে।

 

পরদিন সুহিলপুর এলাকায় মুসল্লিদের বিক্ষোভ মিছিলে পুলিশ ও আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা গুলি চালায়। এতে শহীদ হন কামাল মিয়া, বাদল, কাউছার, নুরুল আমিন, আলম, সুজন, হাফেজ জোবায়ের ও জামিয়া ইউনুছিয়ার মাদরাসার ছাত্র মোহাম্মদ হোসাইন। এদের মধ্যে মোহাম্মদ হোসাইন কালীবাড়ী মোড়ে এবং বাকিরা কুমিল্লা-সিলেট মহাসড়কে নিহত হন। আরো নিহত হনÑসরাইল পাঠানপাড়া হাফিজিয়া মাদরাসার সাবেক ছাত্র আলামিন, লিটন মিয়া, কামালউদ্দীন, কালন মিয়া, হাদিছ মিয়া, ওয়াহিদুল ইসলাম রুমন, মুশাহিদ এবং জহিরুল ইসলাম।

 

বিনা চিকিৎসায় মৃত্যু

 

২৭ মার্চ সন্ধ্যায় ব্রাহ্মণবাড়িয়ার সুহিলপুর ৩ নম্বর গ্যাস ফিল্ড এরিয়ার কুমিল্লা-সিলেট মহাসড়কে বিক্ষোভকারীদের ওপর নির্বিচারে গুলি চালায় পুলিশ ও আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা। এ সময় কিশোর আসাদুল্লাহ রাতিনসহ বেশ কয়েকজন গুলিবিদ্ধ হয়ে রাস্তায় লুটিয়ে পড়ে। কিশোর রাতিনকে পিটিয়ে ক্ষতবিক্ষত করার পর তার মুখে অস্ত্র ঠেকিয়ে গুলি করা হয়। মারাত্মক আহত রাতিনকে মৃত ভেবে কুমিল্লা সরকারি হাসপাতাল মর্গে নিয়ে যায় পুলিশ। রাতে মর্গে জ্ঞান ফিরলে সে তার বাবাকে ফোন করে। রাতিনকে তার বাবা কুমিল্লা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, ঢাকা নিউরো সার্জারি হাসপাতাল ও সর্বশেষ ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে গেলেও কোনো হাসপাতাল কর্তৃপক্ষই তার চিকিৎসা করতে রাজি হয়নি। একপর্যায়ে বিনা চিকিৎসায় ৩০ মার্চ কিশোর রাতিন মারা যায়।

 

ইমাম-খতিবদের চাকুরিচ্যুতি-নির্যাতন

 

মোদিবিরোধী ওই বিক্ষোভে এতগুলো মানুষকে মেরেই ক্ষান্ত হয়নি পুলিশ, স্থানীয় এমপি উবায়দুল মোকতাদির চৌধুরী ও তার দলের নেতারা। ঘটনার পরপরই পুলিশ ও আওয়ামী লীগ নেতা ৫৪টি মিথ্যা মামলায় প্রায় ১০ হাজার মুসল্লি এবং মাদরাসার ছাত্র-শিক্ষককে আসামি করে।

 

এসব মামলায় ব্রাহ্মণবাড়িয়ার সদর, সরাইল, আখাউড়াসহ স্থানীয় মসজিদ-মাদরাসার ইমাম, খতিব ও মুহতামিমদের তালিকা করে তাদের চাকরিচ্যুত করা হয়। মাদরাসাগুলো থেকে বহু ছাত্রকে বহিষ্কার করা হয়।

 

এ বিষয়ে আশুগঞ্জ কেন্দ্রীয় মসজিদের তৎকালীন ইমাম ও মাদরাসার প্রিন্সিপাল মাওলানা ওবায়দুল্লাহ মাদানী আমার দেশকে বলেন, ঘটনার পর আমার বিরুদ্ধে ১২টি মিথ্যা মামলা দিয়ে আমাকে মসজিদ-মাদরাসা থেকে চাকরিচ্যুৎ করা হয়। এরপর গ্রেপ্তার করে দীর্ঘ ১১ মাস জেলে নির্যাতন করা হয়। সে অবস্থায়ই আমার অসহায় পরিবারকে কোনো নোটিস ছাড়াই বাস্তুচ্যুত করা হয়।

 

বিচারের আশায় দ্বারে দ্বারে ভুক্তভোগীরা

 

কসাই মোদির সফর নির্বিঘ্ন করতে পুরো ব্রাহ্মণবাড়িয়াকে রক্তাক্ত করার পর পুলিশ ও আওয়ামী নেতাকর্মীরা বাদী হয়ে উল্টো হতাহত পরিবারগুলোর বিরুদ্ধে মামলা করেছিল। সব মিলিয়ে সে সময় অর্ধশতাধিক মামলায় আসামি করা হয় ১০ হাজার ধর্মপ্রাণ মানুষকে। হতাহত ভুক্তভোগী পরিবারগুলো ‍বিচার পাওয়া দূরে থাক, ‍উল্টো বিভিন্ন মামলায় জেল-জুলুমের শিকার হচ্ছিল। তারা থানা ও পুলিশ প্রশাসন, কোথাও সুবিচার পাচ্ছিল না।

 

জুলাই বিপ্লবের পর ভুক্তভোগী পরিবারগুলো মামলা করে। এ প্রসঙ্গে শহীদ আল আমিনের বাবা শফি আলী বলেন, আল আমিন কওমি মাদরাসায় হিফজ বিভাগের ছাত্র ছিল। ২০২১ সালের ২৮ মার্চ সে শহীদ হয়। কিন্তু আজও সন্ত্রাসী বা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কেউ গ্রেপ্তার হয়নি।

 

শহীদ লিটনের ভাই মামুন বলেন, আমার বড় ভাই ছিল অটোরিকশাচালক। ২০২১ সালে বাংলাদেশে নরেদ্র মোদির আগমনের প্রতিবাদে তিনিও মুসল্লিদের সঙ্গে রাজপথে নামেন। ব্রাহ্মণবাড়িয়ার পীরবাড়িতে পুলিশের গুলিতে তিনি গুরুতর আহত হন। পরে হাসপাতালে বিনা চিকিৎসায় মারা যান।

 

ব্রাহ্মণবাড়িয়ার বর্তমান অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (অপরাধ ও প্রশাসন) ওবায়দুর রহমান এ প্রসঙ্গে আমার দেশকে বলেন, নরেন্দ্র মোদির বাংলাদেশে আগমনকে কেন্দ্র করে ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় আন্দোলনে নিহতের ঘটনায় ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর সাতটি মামলা হয়েছে। এসব মামলায় অনেককে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। মামলাগুলো তদন্তাধীন পর্যায়ে রয়েছে।

 

গণহত্যার মামলা অপরাধ ট্রাইব্যুনালে

 

ব্রাহ্মণবাড়িয়া গণহত্যায় নিহত আসাদুল্লাহ রাতিনের বাবা সুহিলপুর এলাকার শফিকুর রহমান আমার দেশকে বলেন, ওই গণহত্যায় সরাসরি শেখ হাসিনা, তার স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল, স্থানীয় এমপি উবায়দুল মোক্তাদির চৌধুরী এবং স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতাকর্মী ও প্রশাসন জড়িত। তাই আমি আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে এ তিনজনের সঙ্গে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার তৎকালীন পুলিশ সুপার আনিসুর রহমান, অতিরিক্ত পুলিশ সুপার আবু সাঈদ, তৎকালীন সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা পঙ্কজ পাল, অ্যাডিশনাল এসপি রইছ উদ্দিন, ওসি আব্দুর রহিম, জেলা যুবলীগের সভাপতি শাহনূর ইসলাম ও সাধারণ সম্পাদক সিরাজুল ইসলাম ফেরদৌসসহ ১৪ জনকে আসামি করে মামলা দায়ের করেছি। আশা করছি আমরা এ গণহত্যার বিচার পাব।

 

এ প্রসঙ্গে ট্রাইব্যুনালের প্রসিকিউটর এসএম তাসমিরুল ইসলাম বলেন, মোদিবিরোধী বিক্ষোভে সারা দেশ, বিশেষ করে দেশের ইতিহাসে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নৃশংসতম গণহত্যার তদন্ত আমরা শুরু করেছি। আমরা দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি, শহীদ পরিবার ও ভুক্তভোগীরা সুবিচার পাবে। জড়িতদের কাউকে ছাড় দেওয়া হবে না। ইতোমধ্যে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার আওয়ামী লীগের এমপি উবায়দুল মোকতাদির চৌধুরীকে এ মামলায় গ্রেপ্তার দেখানো হয়েছে।

জনপ্রিয় সংবাদ

নির্বাচনী প্রচারণাকে কেন্দ্র করে ভোলায় বিএনপি-জামায়াতের সংঘর্ষ, আহত ২০

চার বছরেও বিচার নেই, অপেক্ষায় ব্রাহ্মণবাড়িয়ার শহীদ পরিবারগুলো

আপডেট সময় ০৩:২৯:২৭ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ৯ জানুয়ারী ২০২৬

 

ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় ২০২১ সালে মোদিবিরোধী বিক্ষোভে ১৭ মুসল্লিকে গুলি করে হত্যা করেছিল তৎকালীন আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। ওই ঘটনায় গুলিবিদ্ধসহ গুরুতর আহত হন পাঁচ শতাধিক মানুষ। তবে ঘটনার সঙ্গে জড়িত স্থানীয় আওয়ামী লীগের নেতাকর্মী ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা আজও ধরাছোঁয়ার বাইরে রয়ে গেছেন। ঘটনার চার বছর পেরিয়ে গেলেও শহীদ পরিবারগুলো এখন পর্যন্ত ন্যায়বিচার পায়নি।

ঘটনার পরপরই পুলিশ বাদী হয়ে ৫৪টি মামলা দায়ের করেছিল। তবে ওই সব মামলায় আসামি করা হয়েছিল ১০ হাজারের বেশি ধর্মপ্রাণ সাধারণ মানুষ ও আলেমকে। এর জেরে ব্রাহ্মণবাড়িয়াজুড়ে বহু ইমাম-খতিব চাকরিচ্যুত হন এবং অনেককে গ্রেপ্তার করা হয়। জুলাই বিপ্লবের পর অন্তর্বর্তী সরকারের দেড় বছর পার হলেও ওই হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িতদের কেউ এখনো বিচারের মুখোমুখি হয়নি।

২০২১ সালের ২৬ মার্চ বাংলাদেশের ৫১তম স্বাধীনতা দিবসের অনুষ্ঠানে যোগ দিতে শেখ হাসিনার আমন্ত্রণে ঢাকায় আসেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। তার আগমনের প্রতিবাদে সেদিন জুমার নামাজের পর জাতীয় মসজিদ বায়তুল মোকাররম প্রাঙ্গণসহ সারা দেশের মুসল্লিরা প্রতিবাদ জানান। মোদি‍বিরোধী ওই বিক্ষোভে বিনা উসকানিতে ব্রাহ্মণবাড়িয়াসহ সারা দেশে মুসল্লিদের ওপর গুলি চালানো হয়। বাবরি মসজিদ ইস্যুর পাশাপাশি ভারতের সংখ্যালঘু মুসলমানদের ওপর নির্যাতন এবং হিন্দুত্ববাদী দৃষ্টিভঙ্গির জন্য মোদির বাংলাদেশ সফরের বিরোধিতা করে আসছিলেন এ দেশের মানুষ।

 

বিনা উসকানিতে মারা হয় ১৭ মুসল্লিকে

 

২০২১ সালে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নৃশংস ঘটনাটি ছিল দেশের ইতিহাসে অন্যতম বর্বরোচিত হত্যাকাণ্ড। ব্রাহ্মণবাড়িয়ার তৎকালীন আওয়ামী লীগ এমপি ও গৃহায়ন ও গণপূর্তমন্ত্রী র আ ম উবায়দুল মোকতাদির চৌধুরী ছিলেন ওই গণহত্যার নেতৃত্বে। সে সময় নির্বিচারে ১৭ নিরপরাধ ছাত্র-জনতাকে গুলি করে হত্যা করা হয়। আহত ও পঙ্গুত্ববরণ করেন প্রায় ৫০০ মানুষ।

 

ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় সবচেয়ে রক্তাক্ত দিন ছিল ২৭ ও ২৮ মার্চ। ২৬ মার্চ শুরু হয় বিক্ষোভ। তারই ধারাবাহিকতায় ২৭ মার্চ শহরের বিভিন্ন স্থানে পরিকল্পিতভাবে নিরীহ মুসল্লিদের ওপর দফায় দফায় হামলা চালানো হয়। আওয়ামী লীগ, ছাত্রলীগ ও যুবলীগের নেতাকর্মীরা অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে শহরের শতবছরের পুরোনো ঐতিহ্যবাহী কান্দিপাড়ার জামিয়া ইসলামিয়া ইউনুছিয়া মাদরাসা ও জামিয়া সিরাজুল উলুম মাদরাসায় হামলা চালায় । এ সময় আতঙ্কিত মাদরাসাছাত্ররা মসজিদের মাইকে আক্রান্ত হওয়ার খবর প্রচার করেন। এতে স্থানীয় লোকজন এক হয়ে আওয়ামী লীগের ক্যাডারদের ধাওয়া করলে পুলিশ ও হামলাকারীরা মাদরাসাছাত্র ও মুসল্লিদের ওপর গুলি চালায়। এতে ঘটনাস্থলেই আশিকসহ (২০) বেশ কয়েকজন গুলিবিদ্ধ হয়ে মারা যান। আহতদের আহাজারিতে আকাশ-বাতাস ভারী হয়ে ওঠে। পরে মুসল্লিদের বিক্ষোভ শহরের সুহিলপুর, ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক, ভাদুঘর, কুমারশীল মোড়, মেড্ডাসহ বিভিন্ন জায়গায় ছড়িয়ে পড়ে।

 

পরদিন সুহিলপুর এলাকায় মুসল্লিদের বিক্ষোভ মিছিলে পুলিশ ও আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা গুলি চালায়। এতে শহীদ হন কামাল মিয়া, বাদল, কাউছার, নুরুল আমিন, আলম, সুজন, হাফেজ জোবায়ের ও জামিয়া ইউনুছিয়ার মাদরাসার ছাত্র মোহাম্মদ হোসাইন। এদের মধ্যে মোহাম্মদ হোসাইন কালীবাড়ী মোড়ে এবং বাকিরা কুমিল্লা-সিলেট মহাসড়কে নিহত হন। আরো নিহত হনÑসরাইল পাঠানপাড়া হাফিজিয়া মাদরাসার সাবেক ছাত্র আলামিন, লিটন মিয়া, কামালউদ্দীন, কালন মিয়া, হাদিছ মিয়া, ওয়াহিদুল ইসলাম রুমন, মুশাহিদ এবং জহিরুল ইসলাম।

 

বিনা চিকিৎসায় মৃত্যু

 

২৭ মার্চ সন্ধ্যায় ব্রাহ্মণবাড়িয়ার সুহিলপুর ৩ নম্বর গ্যাস ফিল্ড এরিয়ার কুমিল্লা-সিলেট মহাসড়কে বিক্ষোভকারীদের ওপর নির্বিচারে গুলি চালায় পুলিশ ও আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা। এ সময় কিশোর আসাদুল্লাহ রাতিনসহ বেশ কয়েকজন গুলিবিদ্ধ হয়ে রাস্তায় লুটিয়ে পড়ে। কিশোর রাতিনকে পিটিয়ে ক্ষতবিক্ষত করার পর তার মুখে অস্ত্র ঠেকিয়ে গুলি করা হয়। মারাত্মক আহত রাতিনকে মৃত ভেবে কুমিল্লা সরকারি হাসপাতাল মর্গে নিয়ে যায় পুলিশ। রাতে মর্গে জ্ঞান ফিরলে সে তার বাবাকে ফোন করে। রাতিনকে তার বাবা কুমিল্লা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, ঢাকা নিউরো সার্জারি হাসপাতাল ও সর্বশেষ ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে গেলেও কোনো হাসপাতাল কর্তৃপক্ষই তার চিকিৎসা করতে রাজি হয়নি। একপর্যায়ে বিনা চিকিৎসায় ৩০ মার্চ কিশোর রাতিন মারা যায়।

 

ইমাম-খতিবদের চাকুরিচ্যুতি-নির্যাতন

 

মোদিবিরোধী ওই বিক্ষোভে এতগুলো মানুষকে মেরেই ক্ষান্ত হয়নি পুলিশ, স্থানীয় এমপি উবায়দুল মোকতাদির চৌধুরী ও তার দলের নেতারা। ঘটনার পরপরই পুলিশ ও আওয়ামী লীগ নেতা ৫৪টি মিথ্যা মামলায় প্রায় ১০ হাজার মুসল্লি এবং মাদরাসার ছাত্র-শিক্ষককে আসামি করে।

 

এসব মামলায় ব্রাহ্মণবাড়িয়ার সদর, সরাইল, আখাউড়াসহ স্থানীয় মসজিদ-মাদরাসার ইমাম, খতিব ও মুহতামিমদের তালিকা করে তাদের চাকরিচ্যুত করা হয়। মাদরাসাগুলো থেকে বহু ছাত্রকে বহিষ্কার করা হয়।

 

এ বিষয়ে আশুগঞ্জ কেন্দ্রীয় মসজিদের তৎকালীন ইমাম ও মাদরাসার প্রিন্সিপাল মাওলানা ওবায়দুল্লাহ মাদানী আমার দেশকে বলেন, ঘটনার পর আমার বিরুদ্ধে ১২টি মিথ্যা মামলা দিয়ে আমাকে মসজিদ-মাদরাসা থেকে চাকরিচ্যুৎ করা হয়। এরপর গ্রেপ্তার করে দীর্ঘ ১১ মাস জেলে নির্যাতন করা হয়। সে অবস্থায়ই আমার অসহায় পরিবারকে কোনো নোটিস ছাড়াই বাস্তুচ্যুত করা হয়।

 

বিচারের আশায় দ্বারে দ্বারে ভুক্তভোগীরা

 

কসাই মোদির সফর নির্বিঘ্ন করতে পুরো ব্রাহ্মণবাড়িয়াকে রক্তাক্ত করার পর পুলিশ ও আওয়ামী নেতাকর্মীরা বাদী হয়ে উল্টো হতাহত পরিবারগুলোর বিরুদ্ধে মামলা করেছিল। সব মিলিয়ে সে সময় অর্ধশতাধিক মামলায় আসামি করা হয় ১০ হাজার ধর্মপ্রাণ মানুষকে। হতাহত ভুক্তভোগী পরিবারগুলো ‍বিচার পাওয়া দূরে থাক, ‍উল্টো বিভিন্ন মামলায় জেল-জুলুমের শিকার হচ্ছিল। তারা থানা ও পুলিশ প্রশাসন, কোথাও সুবিচার পাচ্ছিল না।

 

জুলাই বিপ্লবের পর ভুক্তভোগী পরিবারগুলো মামলা করে। এ প্রসঙ্গে শহীদ আল আমিনের বাবা শফি আলী বলেন, আল আমিন কওমি মাদরাসায় হিফজ বিভাগের ছাত্র ছিল। ২০২১ সালের ২৮ মার্চ সে শহীদ হয়। কিন্তু আজও সন্ত্রাসী বা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কেউ গ্রেপ্তার হয়নি।

 

শহীদ লিটনের ভাই মামুন বলেন, আমার বড় ভাই ছিল অটোরিকশাচালক। ২০২১ সালে বাংলাদেশে নরেদ্র মোদির আগমনের প্রতিবাদে তিনিও মুসল্লিদের সঙ্গে রাজপথে নামেন। ব্রাহ্মণবাড়িয়ার পীরবাড়িতে পুলিশের গুলিতে তিনি গুরুতর আহত হন। পরে হাসপাতালে বিনা চিকিৎসায় মারা যান।

 

ব্রাহ্মণবাড়িয়ার বর্তমান অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (অপরাধ ও প্রশাসন) ওবায়দুর রহমান এ প্রসঙ্গে আমার দেশকে বলেন, নরেন্দ্র মোদির বাংলাদেশে আগমনকে কেন্দ্র করে ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় আন্দোলনে নিহতের ঘটনায় ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর সাতটি মামলা হয়েছে। এসব মামলায় অনেককে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। মামলাগুলো তদন্তাধীন পর্যায়ে রয়েছে।

 

গণহত্যার মামলা অপরাধ ট্রাইব্যুনালে

 

ব্রাহ্মণবাড়িয়া গণহত্যায় নিহত আসাদুল্লাহ রাতিনের বাবা সুহিলপুর এলাকার শফিকুর রহমান আমার দেশকে বলেন, ওই গণহত্যায় সরাসরি শেখ হাসিনা, তার স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল, স্থানীয় এমপি উবায়দুল মোক্তাদির চৌধুরী এবং স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতাকর্মী ও প্রশাসন জড়িত। তাই আমি আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে এ তিনজনের সঙ্গে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার তৎকালীন পুলিশ সুপার আনিসুর রহমান, অতিরিক্ত পুলিশ সুপার আবু সাঈদ, তৎকালীন সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা পঙ্কজ পাল, অ্যাডিশনাল এসপি রইছ উদ্দিন, ওসি আব্দুর রহিম, জেলা যুবলীগের সভাপতি শাহনূর ইসলাম ও সাধারণ সম্পাদক সিরাজুল ইসলাম ফেরদৌসসহ ১৪ জনকে আসামি করে মামলা দায়ের করেছি। আশা করছি আমরা এ গণহত্যার বিচার পাব।

 

এ প্রসঙ্গে ট্রাইব্যুনালের প্রসিকিউটর এসএম তাসমিরুল ইসলাম বলেন, মোদিবিরোধী বিক্ষোভে সারা দেশ, বিশেষ করে দেশের ইতিহাসে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নৃশংসতম গণহত্যার তদন্ত আমরা শুরু করেছি। আমরা দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি, শহীদ পরিবার ও ভুক্তভোগীরা সুবিচার পাবে। জড়িতদের কাউকে ছাড় দেওয়া হবে না। ইতোমধ্যে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার আওয়ামী লীগের এমপি উবায়দুল মোকতাদির চৌধুরীকে এ মামলায় গ্রেপ্তার দেখানো হয়েছে।