অবৈধ অস্ত্র উদ্ধার ও অপরাধীদের ধরতে দেশে চলছে অপারেশন ডেভিল হান্ট ফেজ-২।আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর তৎপরতাও বেড়েছে। আসন্ন ত্রয়োদশজাতীয় সংসদ নির্বাচন আয়োজন নিয়ে ইসি ও প্রশাসনের সকল স্তরে চলছে ব্যাপক প্রস্তুতি। এমন পরিস্থিতিতে সিলেটজুড়ে আতংক বাড়াচ্ছে আগ্নেয়াস্ত্র। শুধু তাই নয়, সিলেটে সীমান্তে আগ্নেয়াস্ত্রের পাশাপাশি উদ্ধার হচ্ছে শক্তিশালী বিস্ফোরক দ্রব্য ও ডেটোনেটর। পাওয়া যাচ্ছে সাউন্ড গ্রেনেডও।
সিলেটসহ সারাদেশে লুণ্ঠিত পুলিশের অস্ত্র ও গোলাবারুদ উদ্ধার কার্যক্রম জোরদার করতে ইতিমধ্যে আর্থিক পুরস্কার ঘোষণা করেছে সরকার। সরকারের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, পুলিশের লুণ্ঠিত বিভিন্ন ধরনের অস্ত্র ও গোলাবারুদের সঠিক সন্ধান দিতে পারলে প্রকৃত তথ্যদাতাকে নির্ধারিত পুরস্কার প্রদান করা হবে।
বাংলাদেশ পুলিশের বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, লুণ্ঠিত পিস্তল ও শটগান উদ্ধারে তথ্য দিলে ৫০ হাজার টাকা, চায়না রাইফেলের ক্ষেত্রে এক লাখ টাকা, এসএমজির জন্য দেড় লাখ টাকা এবং এলএমজি উদ্ধারে পাঁচ লাখ টাকা পর্যন্ত পুরস্কার দেওয়া হবে। এছাড়া প্রতি রাউন্ড গুলির তথ্যের জন্য ৫০০ টাকা পুরস্কার নির্ধারণ করা হয়েছে।
কিন্তু এতেও সিলেটে উদ্ধার হচ্ছেনা আগ্নোয়াস্ত্র। ফলে নির্বাচনকালীন সময়ের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে অনেকের মনে শঙ্কা জাগছে।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ২০২৫ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী সরকারের পতনের পর সিলেট মহানগরীর ৬টি থানা ও কয়েকটি ফাঁড়িতে হামলা চালিয়ে দুর্বৃত্তরা লুট করে বিপুল পরিমাণ অস্ত্র ও গুলি। পুলিশের তথ্যমতে, মোট ১০১টি আগ্নেয়াস্ত্র ও ৫৭৪০ রাউন্ড গুলি লুট হয়। বেশ কিছু অস্ত্র ও গোলা-বারুদ উদ্ধারও হয়েছে। এরপরও এখনো ১৮টি অস্ত্র ও ৫১৯৯ রাউন্ড গুলির কোনো হদিস নেই। এছাড়াও ২০২৪ এর জুলাই গণ অভুত্থানের সময় জুলাই-আগস্ট মাসে সিলেট নগরীতে প্রকাশ্যে আগ্নেয়াস্ত্র নিয়ে রাজপথে মহড়া দেয় আওয়ামী লীগের অঙ্গ সংগঠন যুবলীগ ও ছাত্রলীগের একাংশ।
নগরীর আখালিয়া, কোর্ট পয়েন্ট, জিন্দাবাজার ও চৌহাট্টা এলাকায় এসব সশস্ত্র মহড়ায় দেখা গেছে আধুনিক পিস্তল, রাইফেল ও স্নাইপারগান। এসব অস্ত্র ১৮ জুলাই ও ৪ আগস্টের বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সময় প্রকাশ্যে ব্যবহৃত হয়েছে বলে জানিয়েছে পুলিশ। কিন্তু জুলাই গণঅভ্যুত্থানের দেড় বছরেও প্রদর্শিত অস্ত্রের একটিও উদ্ধার করতে পারেনি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারি বাহিনী।
যদিও র্যাবের অভিযানে সিলেট বিভাগ ও ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলা থেকে বেশকিছু আগ্নোয়াস্ত্র উদ্ধার করা হয়েছে। তবে সেসব অস্ত্রের মধ্যে থানা থেকে লুট হওয়া এবং চব্বিশের জুলাই গণ অভ্যুত্থানে সন্ত্রাসীদের ব্যবহৃত অস্ত্রের সংখ্যা ছিল খুবই কম।
র্যাব-৯ সূত্র জানিয়েছে, ২০২৪ এর ৫ আগস্ট থেকে ৬ জানুয়ারী-২০২৬ পর্যন্ত র্যাব-৯, সিলেট বিভাগ ও ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলার দায়িত্বপূর্ণ এলাকা থেকে মোট ৩৩টি দেশী ও বিদেশী আগ্নেয়াস্ত্র, ১০০ রাউন্ড গুলি, ৪টি ম্যাগজিন, ৪৮৮০ গ্রাম বিস্ফোরক, ২৪টি ডেটোনেটর, ১টি সাউন্ড গ্রেনেড এবং বিপুল পরিমাণ এয়ারগানের গুলিসহ ৫০টি এয়ারগান উদ্ধার করেছে।
এছাড়া সিলেটের সীমান্ত এলাকায় বিজিবির অভিযানে বিস্ফোরক, ডেটোনেটর, বিদেশি রিভলভার ও এয়ারগানসহ বেশকিছু অস্ত্র উদ্ধার করা হয়েছে।
সিলেট মহানগর বিএনপির ভারপ্রাপ্ত সভাপতি রেজাউল হাসান কয়েস লোদী বলেন, ‘গত ৫ আগস্ট ২০২৪ পরবর্তীতে লুন্ঠিত অস্ত্রগুলো অতিদ্রুত উদ্ধার করা জরুরি। এসব অস্ত্র দুর্বৃত্তদের হাতে থাকা সবার জন্যই আতঙ্কের। লুট হওয়া অস্ত্র ও গুলি বাইরে থাকা জনগণের জন্য ঝুঁকির কারণ। কারণ মনে রাখতে হবে, যারা এসব অস্ত্র লুট করেছে, তারা কোনোভাবেই সাধারণ জনগণ নয়, তাদের উদ্দেশ্যও মহৎ নয়। তাই দ্রুত অস্ত্র উদ্ধার করা দরকার।’ তিনি আরও বলেন, ‘আগামী ফেব্রুয়ারীতে জাতীয় নির্বাচন। নিষিদ্ধ সংগঠনের নেতা-কর্মীরা এই নির্বাচনকে বানচাল করতে যেকোনো কিছু করতে পারে। তাই প্রশাসনের উচিৎ যতো দ্রুত সম্ভব লুণ্ঠিত অস্ত্র ও সীমান্ত দিয়ে প্রবেশকৃত অস্ত্র উদ্ধার করতে হবে। তাদের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে হবে।’
জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় মজলিসে শূরা সদস্য ও সিলেট জেলা আমীর মাওলানা হাবিবুর রহমান বলেন, ‘আগামী জাতীয় নির্বাচনকে ঘিরে বিভিন্ন স্থানে অবৈধ অস্ত্রের উপস্থিতি উদ্বেগজনকভাবে বেড়ে চলেছে। এই অস্ত্রসমূহ নির্বাচনের সময় সহিংসতায় ব্যবহৃত হতে পারে। আগামী জাতীয় নির্বাচনে এসব অবৈধ অস্ত্র ব্যবহার হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। প্রশাসনের উচিত নির্বাচন শুরুর আগে সকল অবৈধ অস্ত্র উদ্ধার করা এবং সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা।’ তিনি আরও বলেন, ‘শান্তিপূর্ণ, সুষ্ঠু এবং গ্রহণযোগ্য নির্বাচন দেশবাসীর প্রত্যাশা। অবৈধ অস্ত্র উদ্ধার ও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতি না হলে নির্বাচনের পরিবেশ প্রশ্নবিদ্ধ হতে পারে। রাজনৈতিক দলসমূহকে সহিংসতা পরিহারের আহ্বান করছি এবং প্রশাসনকে দায়িত্বশীল ভূমিকা পালনের আহ্বান করছি।’
এ ব্যাপারে র্যাব-৯ সিলেটের মিডিয়া অফিসার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার কে.এম শহিদুল ইসলাম সোহাগ বলেন, মাদক ও অবৈধ অস্ত্র উদ্ধারে র্যাব জিরো টলারেন্স নীতি গ্রহণ করেছে। আমাদের নিয়মিত অভিযান অব্যাহত রয়েছে। বিশেষ করে বিভিন্ন থানা, ফাঁড়ি ও পুলিশ সদস্যদের কাছ থেকে লুণ্ঠিত অস্ত্র ও গোলাবারুদ উদ্ধারে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার ভিত্তিতে র্যাবের গোয়েন্দা তৎপরতা বৃদ্ধি করা হয়েছে।
সিলেট মেট্রোপলিটন পুলিশের মিডিয়া কর্মকর্তা অতিরিক্ত উপ-কমিশনার মোহাম্মদ সাইফুল ইসলাম ইসলাম বলেন, সরকারের পক্ষ থেকে ইতোমধ্যে লুণ্ঠিত অস্ত্র ও গোলাবারুদের বিষয়ে যাদের কাছে নির্ভরযোগ্য তথ্য রয়েছে, তাদের নিকটস্থ থানায় যোগাযোগ করার জন্য অনুরোধ জানানো হচ্ছে। তথ্যদাতার পরিচয় সম্পূর্ণ গোপন রাখা হবে বলেও আশ্বাস দেওয়া হয়েছে। সাথে দেয়া হবে পুরস্কারও।
তিনি বলেন, গণঅভ্যুত্থানের সময় এসএমপির বিভিন্ন থানা থেকে খুয়া যাওয়া অস্ত্র উদ্ধারে আমাদের তৎপরতা অব্যাহত রয়েছে। এছাড়া ২০২৪ এর জুলাই-আগস্টে প্রদর্শিত অস্ত্রধারিদের চিহ্নিত করা হলেও তারা দেশের বাইরে অবস্থান করছে বলে বিভিন্ন সূত্রে জানতে পেরেছি। নির্বাচনকে সামনে রেখে অবৈধ অস্ত্র উদ্ধারে পুলিশ কঠোর অবস্থানে রয়েছে।
সিলেটের জেলা প্রশাসক ও জেলা ম্যাজিস্ট্রেট মো. সারওয়ার আলম বলেন, শান্তিপূর্ণ, সুষ্ঠু এবং গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের স্বার্থে র্যাব, পুলিশ, বিজিবি ও সেনাবাহিনীর অভিযান অব্যাহত রয়েছে। ভারতীয় অবৈধ চোরাচালান কিংবা অবৈধ আগ্নেয়াস্ত্রসহ যেকোনো বিষয়ে সিলেটের সবগুলো সীমান্তে বিজিবিসহ বিভিন্ন বাহিনী সোচ্চার রয়েছে।




















