ঢাকা ১১:২৮ অপরাহ্ন, বুধবার, ১৪ জানুয়ারী ২০২৬, ১ মাঘ ১৪৩২ বঙ্গাব্দ

পাকিস্তানের জেএফ-১৭ যুদ্ধবিমান কেনার তালিকায় যুক্ত হচ্ছে একের পর এক দেশ: দ্য টেলিগ্রাফের রিপোর্ট

  • ডেস্ক রিপোর্টঃ
  • আপডেট সময় ০৯:৫৯:১৪ অপরাহ্ন, বুধবার, ১৪ জানুয়ারী ২০২৬
  • ৫২৩ বার পড়া হয়েছে

যুদ্ধক্ষেত্রে পরীক্ষিত, তুলনামূলকভাবে কম দামে আধুনিক সক্ষমতা— এই তিন কারণেই পাকিস্তানের তৈরি জেএফ–১৭ থান্ডার যুদ্ধবিমান এখন আন্তর্জাতিক বাজারে ব্যাপক আগ্রহের কেন্দ্রবিন্দু। ভারতের সঙ্গে সাম্প্রতিক সংঘাতে দারুণ পারফরম্যান্স দেখানোর পর একের পর এক দেশ এই যুদ্ধবিমান কেনার জন্য আলোচনায় বসছে। সৌদি আরব থেকে শুরু করে বাংলাদেশ, ইরাক, ইন্দোনেশিয়া ও লিবিয়া— পাকিস্তানের এই অত্যাধুনিক ফাইটার জেট এখন কার্যত ‘চাহিদার তালিকায়’ উঠে এসেছে।

 

যুক্তরাজ্যের প্রভাবশালী সংবাদমাধ্যম দ্য টেলিগ্রাফ বলছে, গত বছরের সেপ্টেম্বর মাসে সৌদি আরব ও পাকিস্তান পারস্পরিক প্রতিরক্ষা চুক্তি স্বাক্ষর করার সময়ই স্পষ্ট হয়ে গিয়েছিল যে রিয়াদ ইসলামাবাদের কাছ থেকে ঠিক কী চায়। একই ধরনের আগ্রহ দেখিয়েছে বাংলাদেশ, ইরাক, ইন্দোনেশিয়া এবং লিবিয়ার জাতীয় সেনাবাহিনীও। পাকিস্তানের নিজস্বভাবে উৎপাদিত জেএফ–১৭ থান্ডার যুদ্ধবিমান কেনার বিষয়ে একাধিক দেশের সঙ্গে চুক্তি ইতোমধ্যে সই হয়েছে, আবার কিছু চুক্তি চূড়ান্ত হওয়ার পথে।

কম খরচে উন্নত সক্ষমতার এই যুদ্ধবিমান ভারতের সঙ্গে গত বছরের মে মাসে হওয়া যুদ্ধে বাস্তব যুদ্ধপরীক্ষার মধ্য দিয়ে গেছে। সেই সংঘাতে জেএফ–১৭ ফরাসি নির্মিত রাফাল যুদ্ধবিমানের বিপক্ষে ভালো পারফরম্যান্স দেখায়।

 

এরপর থেকেই একের পর এক দেশ এই বিমান কেনার আগ্রহ দেখাচ্ছে। হালকা ও বহুমুখী সক্ষমতার এই যুদ্ধবিমানটি তৈরি করা হয় ইসলামাবাদ থেকে প্রায় ৫০ মাইল দূরে অবস্থিত পাকিস্তান অ্যারোনটিক্যাল কমপ্লেক্সে (পিএসি)।

 

জেএফ–১৭ থান্ডার যুদ্ধবিমানের ব্লক–২ সংস্করণটি ৪.৫ প্রজন্মের ফাইটার জেট। এতে রয়েছে উন্নত রাডার ও ‘বিয়ন্ড ভিজ্যুয়াল রেঞ্জ’ ক্ষেপণাস্ত্র, যা আকাশে ও স্থলে উভয় ধরনের লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানতে সক্ষম। যুদ্ধবিমানটিতে চীনের তৈরি পিএল–১০ই উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন এয়ার–টু–এয়ার ক্ষেপণাস্ত্র সংযোজিত আছে।

 

এতে আধুনিক অ্যাভিওনিক্স, অ্যাকটিভ ইলেকট্রনিক্যালি স্ক্যানড অ্যারে (এইসা) রাডার ও ইলেকট্রনিক যুদ্ধব্যবস্থাও রয়েছে। পাকিস্তানের মতে, এটি মার্কিন এফ–১৬ ও রুশ এসইউ–২৭ যুদ্ধবিমানের তুলনায় উন্নত সংস্করণ। মার্কিন ও রুশ ওই যুদ্ধবিমানগুলো মূলত গতি ও ডগফাইটের জন্য নকশা করা হয়েছিল।

 

পাকিস্তান বিমান বাহিনী বলছে, মাঝারি ও নিচু উচ্চতায় জেএফ–১৭ যুদ্ধবিমান অত্যন্ত কৌশলী। গোলাবর্ষণ ও ক্ষেপণাস্ত্র ছোঁড়ার শক্তি, গতিশীলতা ও টিকে থাকার সক্ষমতার সমন্বয়ে এটি যে কোনও বিমান বাহিনীর জন্য একটি শক্তিশালী প্ল্যাটফর্ম। এছাড়া এইসা রাডারের কারণে একসঙ্গে একাধিক লক্ষ্যবস্তু তথা টার্গেট শনাক্ত ও ট্র্যাক করা সম্ভব হয়, পাশাপাশি বেশ দূরত্ব থেকেও শত্রুঘাঁটি বা স্থাপনার ওপর স্পষ্ট নজরদারি করা যায়। যদিও এই যুদ্ধবিমানটিতে স্টেলথ প্রযুক্তি নেই, তবু এটি সুইডেনের গ্রিপেন, ফ্রান্সের রাফাল, ইউরোফাইটার টাইফুন ও চীনের জে–১০ যুদ্ধবিমানের মতো একই শ্রেণিতে পড়ে।

 

তবে অন্য যুদ্ধবিমানগুলোর তুলনায় পার্থক্য একটাই। আর তা হচ্ছে জেএফ–১৭ যুদ্ধবিমান অনেক সস্তা। এই যুদ্ধবিমানের আনুমানিক দাম ২ কোটি ৫০ লাখ থেকে ৩ কোটি ডলারের মধ্যে। যেখানে একটি রাফালের দাম ৯ কোটি ডলারের বেশি, গ্রিপেনের দাম ১০ কোটি ডলারের ওপরে, টাইফুনের দাম প্রায় ১১ কোটি ৭০ লাখ ডলার, জে–১০ ফাইটার জেটের দাম প্রায় ৫ কোটি ডলার। আর যুক্তরাষ্ট্রের এফ–৩৫ লাইটনিং–২ যুদ্ধবিমানের দাম প্রায় ১০ কোটি ৯০ লাখ ডলার।

 

জেএফ–১৭ যুদ্ধবিমানের আরেকটি বড় আকর্ষণ হলো— এটি বাস্তব যুদ্ধে কার্যকারিতা প্রমাণ করেছে। ২০১৯ সালের ফেব্রুয়ারি ও ২০২৫ সালে মে মাসে ভারতের সঙ্গে সংঘাতে এই যুদ্ধবিমান তার অত্যাধুনিক সক্ষমতার প্রমাণ দিয়েছে।

 

২০১৯ সালের ফেব্রুয়ারিতে পাকিস্তান একটি ভারতীয় যুদ্ধবিমান ভূপাতিত করে এবং এর পাইলট গ্রুপ ক্যাপ্টেন অভিনন্দন বর্তমানকে আটক করে। যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের হস্তক্ষেপে দুই দিন পর তাকে মুক্তি দেয়া হয়। ওই সংঘাতে ভারতশাসিত কাশ্মিরে ভারতীয় বিমান বাহিনীর পাঁচজন সদস্য ও এক বেসামরিক নাগরিক নিহত হন।

 

আর গত বছরের মে মাসে চার দিনের সংঘাতে পাকিস্তান দাবি করে, তারা তিনটি রাফাল ফাইটার জেটসহ ছয়টি ভারতীয় যুদ্ধবিমান ভূপাতিত করেছে। ভারত ক্ষয়ক্ষতির কথা স্বীকার করলেও তাদের ঠিক কয়টি যুদ্ধবিমান ভূপাতিত হয়েছিল তার নির্দিষ্ট সংখ্যা জানায়নি দিল্লি।

পাকিস্তান বিমান বাহিনী জানায়, মে মাসের সেই সংঘাতে জেএফ–১৭ থান্ডার যুদ্ধবিমান ভারতীয় বিমান প্রতিহত করার অভিযানে অংশ নেয় এবং হাইপারসনিক ক্ষেপণাস্ত্র দিয়ে ভারতের রুশ নির্মিত এস–৪০০ আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থায় আঘাত হানে। তবে ভারত এই দাবিকে অস্বীকার করেছে।

 

চারদিনের সেই সংঘাত গত ১০ মে হঠাৎ করেই থেমে যায়। সেসময় যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ‘পূর্ণাঙ্গ ও তাৎক্ষণিক যুদ্ধবিরতি’ ঘোষণা করেন। পরে সম্ভাব্য পারমাণবিক সংঘাত ঠেকানোর কৃতিত্ব দিয়ে পাকিস্তান তাকে নোবেল শান্তি পুরস্কারের জন্য মনোনয়ন দেয়। ট্রাম্প নিজেও একাধিকবার বলেন, ছয় থেকে আটটি যুদ্ধবিমান ভূপাতিত হয়েছে। আর এটিই পাকিস্তান বিমান বাহিনীর সক্ষমতা তুলে ধরে বিশ্বের সামনে।

 

পাকিস্তানের জেএফ–১৭ থান্ডার যুদ্ধবিমানের এই সক্ষমতা ও প্রতিযোগিতামূলক দামের কারণে অত্যাধুনিক এই ফাইটার জেটটি ছোট দেশগুলোর নজরে আসে আরও আগেই। ২০১৫ সালে মিয়ানমার প্রথম দেশ হিসেবে জেএফ–১৭ ফাইটার জেট কিনেছিল। মোট ১৫টির মধ্যে এখন পর্যন্ত সাতটি ফাইটার জেট সরবরাহ করা হয়েছে। আর সামরিক জান্তার ওপর নিষেধাজ্ঞার কারণে বাকি যুদ্ধবিমানগুলো সরবরাহে দেরি হচ্ছে।

এছাড়া ২০২১ সালে নাইজেরিয়া তিনটি জেএফ–১৭ যুদ্ধবিমান কেনে। ২০২৪ সালের ফেব্রুয়ারিতে আজারবাইজান ১৬টি যুদ্ধবিমান কিনতে ১৫০ কোটি ডলারের চুক্তি করে। আর গত বছরের নভেম্বরে দেশটি বিজয় দিবসের কুচকাওয়াজে পাঁচটি জেএফ–১৭ যুদ্ধবিমান প্রদর্শন করে।

 

বিশ্লেষকদের মতে, গত বছরের মে মাসের যুদ্ধের পর, বিশেষ করে ভারতীয় রাফাল ফাইটার জেট ভূপাতিত হওয়ার পর জেএফ–১৭ যুদ্ধবিমানের চাহিদা ব্যাপকভাবে বেড়েছে।

 

ছয় দেশের সঙ্গে চুক্তি বা আলোচনা

 

চলতি বছরের ৬ জানুয়ারি পাকিস্তানের বিমান বাহিনীর প্রধান জাহির আহমদ বাবর সিধু ও বাংলাদেশের বিমান বাহিনীর প্রধান হাসান মাহমুদ খান ইসলামাবাদে বৈঠক করেন। সেখানে জেএফ–১৭ থান্ডার যুদ্ধবিমান কেনার সম্ভাবনা নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়।

 

পাকিস্তানের সামরিক বাহিনীর গণমাধ্যম শাখা আইএসপিআর জানিয়েছে, বাংলাদেশে জেএফ–১৭ থান্ডার যুদ্ধবিমান বিক্রির চুক্তি শিগগিরই চূড়ান্ত হতে যাচ্ছে।

 

এরপর গত সোমবার বার্তাসংস্থা রয়টার্স জানায়, ইন্দোনেশিয়ার প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইসলামাবাদে পাকিস্তানের বিমান বাহিনীর প্রধানের সঙ্গে বৈঠক করেছেন। আলোচনায় জেএফ–১৭ বিক্রির বিষয়টি ছিল। একটি সূত্র জানায়, জাকার্তা ৪০টিরও বেশি জেএফ-১৭ যুদ্ধবিমান কিনতে পারে।

ইরাকও এই যুদ্ধবিমান কেনার বিষয়ে ‘গভীর আগ্রহ’ দেখিয়েছে। এর এক মাসেরও কম সময় আগে লিবিয়ার জাতীয় সেনাবাহিনীর সঙ্গে ৪০০ কোটি ডলারের চুক্তি হয় পাকিস্তানের। এই চুক্তির আওতায় এক ডজনেরও বেশি জেএফ–১৭ যুদ্ধবিমান সরবরাহের কথা রয়েছে।

 

এছাড়া সৌদি আরবের দেয়া প্রায় ২০০ কোটি ডলারের ঋণকে জেএফ–১৭ যুদ্ধবিমান কেনার চুক্তিতে রূপান্তর করার বিষয়েও দুই দেশ আলোচনা চালাচ্ছে।

 

সাবেক এয়ার মার্শাল ও বিশ্লেষক আমির মাসুদ বলেন, পাকিস্তান অন্তত ছয়টি দেশের সঙ্গে জেএফ–১৭ যুদ্ধবিমানসহ বিভিন্ন প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম সরবরাহ নিয়ে চুক্তি করেছে বা আলোচনা চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে। তিনি সৌদি আরবের নাম উল্লেখ করলেও আলোচনার বিস্তারিত নিশ্চিত করেননি।

 

দ্য টেলিগ্রাফ বলছে, পাকিস্তান বর্তমানে ৭০০ কোটি ডলারের আইএমএফ কর্মসূচির আওতায় রয়েছে। ২০২৩ সালে ঋণখেলাপি এড়াতে নেয়া স্বল্পমেয়াদি ৩০০ কোটি ডলারের চুক্তির পর এই কর্মসূচির আওতায় আসে দেশটি। সৌদি আরব ও উপসাগরীয় মিত্রদের সহায়তায় এই কর্মসূচি নিশ্চিত হয়।

 

স্টিমসন সেন্টারের দক্ষিণ এশিয়া কর্মসূচির গবেষক ও নিউইয়র্কের অ্যালবানি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ক্রিস্টোফার ক্ল্যারি বলেন, জেএফ–১৭ যুদ্ধবিমান রপ্তানিতে পাকিস্তান বাস্তব সাফল্য পেয়েছে। প্রতিরক্ষা রপ্তানি শিল্প গড়ে তুলতে পারলে আন্তর্জাতিক অবস্থান ও বৈদেশিক মুদ্রা আয় যেমন বাড়বে, তেমনি এর পাশাপাশি নিজেদের প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম কেনাকাটায়ও সুবিধা হবে পাকিস্তানের।

 

এমন অবস্থায় গত সপ্তাহে পাকিস্তানের প্রতিরক্ষামন্ত্রী খাজা আসিফ বলেন, অস্ত্র শিল্পের এই সাফল্য দেশের অর্থনৈতিক চিত্রই পাল্টে দিতে পারে। তিনি জিও নিউজকে বলেন, ‘আমাদের বিমানগুলো (যুদ্ধক্ষেত্রে) পরীক্ষিত। বর্তমানে এতো এতো অর্ডার আসছে যে আগামী ছয় মাসের মধ্যে পাকিস্তানের আইএমএফের প্রয়োজনই নাও হতে পারে।’

জনপ্রিয় সংবাদ

ইরানের পক্ষে দাঁড়াল সৌদি আরব, আকাশসীমা ব্যবহার করতে যুক্তরাষ্ট্রকে নিষেধাজ্ঞা

পাকিস্তানের জেএফ-১৭ যুদ্ধবিমান কেনার তালিকায় যুক্ত হচ্ছে একের পর এক দেশ: দ্য টেলিগ্রাফের রিপোর্ট

আপডেট সময় ০৯:৫৯:১৪ অপরাহ্ন, বুধবার, ১৪ জানুয়ারী ২০২৬

যুদ্ধক্ষেত্রে পরীক্ষিত, তুলনামূলকভাবে কম দামে আধুনিক সক্ষমতা— এই তিন কারণেই পাকিস্তানের তৈরি জেএফ–১৭ থান্ডার যুদ্ধবিমান এখন আন্তর্জাতিক বাজারে ব্যাপক আগ্রহের কেন্দ্রবিন্দু। ভারতের সঙ্গে সাম্প্রতিক সংঘাতে দারুণ পারফরম্যান্স দেখানোর পর একের পর এক দেশ এই যুদ্ধবিমান কেনার জন্য আলোচনায় বসছে। সৌদি আরব থেকে শুরু করে বাংলাদেশ, ইরাক, ইন্দোনেশিয়া ও লিবিয়া— পাকিস্তানের এই অত্যাধুনিক ফাইটার জেট এখন কার্যত ‘চাহিদার তালিকায়’ উঠে এসেছে।

 

যুক্তরাজ্যের প্রভাবশালী সংবাদমাধ্যম দ্য টেলিগ্রাফ বলছে, গত বছরের সেপ্টেম্বর মাসে সৌদি আরব ও পাকিস্তান পারস্পরিক প্রতিরক্ষা চুক্তি স্বাক্ষর করার সময়ই স্পষ্ট হয়ে গিয়েছিল যে রিয়াদ ইসলামাবাদের কাছ থেকে ঠিক কী চায়। একই ধরনের আগ্রহ দেখিয়েছে বাংলাদেশ, ইরাক, ইন্দোনেশিয়া এবং লিবিয়ার জাতীয় সেনাবাহিনীও। পাকিস্তানের নিজস্বভাবে উৎপাদিত জেএফ–১৭ থান্ডার যুদ্ধবিমান কেনার বিষয়ে একাধিক দেশের সঙ্গে চুক্তি ইতোমধ্যে সই হয়েছে, আবার কিছু চুক্তি চূড়ান্ত হওয়ার পথে।

কম খরচে উন্নত সক্ষমতার এই যুদ্ধবিমান ভারতের সঙ্গে গত বছরের মে মাসে হওয়া যুদ্ধে বাস্তব যুদ্ধপরীক্ষার মধ্য দিয়ে গেছে। সেই সংঘাতে জেএফ–১৭ ফরাসি নির্মিত রাফাল যুদ্ধবিমানের বিপক্ষে ভালো পারফরম্যান্স দেখায়।

 

এরপর থেকেই একের পর এক দেশ এই বিমান কেনার আগ্রহ দেখাচ্ছে। হালকা ও বহুমুখী সক্ষমতার এই যুদ্ধবিমানটি তৈরি করা হয় ইসলামাবাদ থেকে প্রায় ৫০ মাইল দূরে অবস্থিত পাকিস্তান অ্যারোনটিক্যাল কমপ্লেক্সে (পিএসি)।

 

জেএফ–১৭ থান্ডার যুদ্ধবিমানের ব্লক–২ সংস্করণটি ৪.৫ প্রজন্মের ফাইটার জেট। এতে রয়েছে উন্নত রাডার ও ‘বিয়ন্ড ভিজ্যুয়াল রেঞ্জ’ ক্ষেপণাস্ত্র, যা আকাশে ও স্থলে উভয় ধরনের লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানতে সক্ষম। যুদ্ধবিমানটিতে চীনের তৈরি পিএল–১০ই উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন এয়ার–টু–এয়ার ক্ষেপণাস্ত্র সংযোজিত আছে।

 

এতে আধুনিক অ্যাভিওনিক্স, অ্যাকটিভ ইলেকট্রনিক্যালি স্ক্যানড অ্যারে (এইসা) রাডার ও ইলেকট্রনিক যুদ্ধব্যবস্থাও রয়েছে। পাকিস্তানের মতে, এটি মার্কিন এফ–১৬ ও রুশ এসইউ–২৭ যুদ্ধবিমানের তুলনায় উন্নত সংস্করণ। মার্কিন ও রুশ ওই যুদ্ধবিমানগুলো মূলত গতি ও ডগফাইটের জন্য নকশা করা হয়েছিল।

 

পাকিস্তান বিমান বাহিনী বলছে, মাঝারি ও নিচু উচ্চতায় জেএফ–১৭ যুদ্ধবিমান অত্যন্ত কৌশলী। গোলাবর্ষণ ও ক্ষেপণাস্ত্র ছোঁড়ার শক্তি, গতিশীলতা ও টিকে থাকার সক্ষমতার সমন্বয়ে এটি যে কোনও বিমান বাহিনীর জন্য একটি শক্তিশালী প্ল্যাটফর্ম। এছাড়া এইসা রাডারের কারণে একসঙ্গে একাধিক লক্ষ্যবস্তু তথা টার্গেট শনাক্ত ও ট্র্যাক করা সম্ভব হয়, পাশাপাশি বেশ দূরত্ব থেকেও শত্রুঘাঁটি বা স্থাপনার ওপর স্পষ্ট নজরদারি করা যায়। যদিও এই যুদ্ধবিমানটিতে স্টেলথ প্রযুক্তি নেই, তবু এটি সুইডেনের গ্রিপেন, ফ্রান্সের রাফাল, ইউরোফাইটার টাইফুন ও চীনের জে–১০ যুদ্ধবিমানের মতো একই শ্রেণিতে পড়ে।

 

তবে অন্য যুদ্ধবিমানগুলোর তুলনায় পার্থক্য একটাই। আর তা হচ্ছে জেএফ–১৭ যুদ্ধবিমান অনেক সস্তা। এই যুদ্ধবিমানের আনুমানিক দাম ২ কোটি ৫০ লাখ থেকে ৩ কোটি ডলারের মধ্যে। যেখানে একটি রাফালের দাম ৯ কোটি ডলারের বেশি, গ্রিপেনের দাম ১০ কোটি ডলারের ওপরে, টাইফুনের দাম প্রায় ১১ কোটি ৭০ লাখ ডলার, জে–১০ ফাইটার জেটের দাম প্রায় ৫ কোটি ডলার। আর যুক্তরাষ্ট্রের এফ–৩৫ লাইটনিং–২ যুদ্ধবিমানের দাম প্রায় ১০ কোটি ৯০ লাখ ডলার।

 

জেএফ–১৭ যুদ্ধবিমানের আরেকটি বড় আকর্ষণ হলো— এটি বাস্তব যুদ্ধে কার্যকারিতা প্রমাণ করেছে। ২০১৯ সালের ফেব্রুয়ারি ও ২০২৫ সালে মে মাসে ভারতের সঙ্গে সংঘাতে এই যুদ্ধবিমান তার অত্যাধুনিক সক্ষমতার প্রমাণ দিয়েছে।

 

২০১৯ সালের ফেব্রুয়ারিতে পাকিস্তান একটি ভারতীয় যুদ্ধবিমান ভূপাতিত করে এবং এর পাইলট গ্রুপ ক্যাপ্টেন অভিনন্দন বর্তমানকে আটক করে। যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের হস্তক্ষেপে দুই দিন পর তাকে মুক্তি দেয়া হয়। ওই সংঘাতে ভারতশাসিত কাশ্মিরে ভারতীয় বিমান বাহিনীর পাঁচজন সদস্য ও এক বেসামরিক নাগরিক নিহত হন।

 

আর গত বছরের মে মাসে চার দিনের সংঘাতে পাকিস্তান দাবি করে, তারা তিনটি রাফাল ফাইটার জেটসহ ছয়টি ভারতীয় যুদ্ধবিমান ভূপাতিত করেছে। ভারত ক্ষয়ক্ষতির কথা স্বীকার করলেও তাদের ঠিক কয়টি যুদ্ধবিমান ভূপাতিত হয়েছিল তার নির্দিষ্ট সংখ্যা জানায়নি দিল্লি।

পাকিস্তান বিমান বাহিনী জানায়, মে মাসের সেই সংঘাতে জেএফ–১৭ থান্ডার যুদ্ধবিমান ভারতীয় বিমান প্রতিহত করার অভিযানে অংশ নেয় এবং হাইপারসনিক ক্ষেপণাস্ত্র দিয়ে ভারতের রুশ নির্মিত এস–৪০০ আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থায় আঘাত হানে। তবে ভারত এই দাবিকে অস্বীকার করেছে।

 

চারদিনের সেই সংঘাত গত ১০ মে হঠাৎ করেই থেমে যায়। সেসময় যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ‘পূর্ণাঙ্গ ও তাৎক্ষণিক যুদ্ধবিরতি’ ঘোষণা করেন। পরে সম্ভাব্য পারমাণবিক সংঘাত ঠেকানোর কৃতিত্ব দিয়ে পাকিস্তান তাকে নোবেল শান্তি পুরস্কারের জন্য মনোনয়ন দেয়। ট্রাম্প নিজেও একাধিকবার বলেন, ছয় থেকে আটটি যুদ্ধবিমান ভূপাতিত হয়েছে। আর এটিই পাকিস্তান বিমান বাহিনীর সক্ষমতা তুলে ধরে বিশ্বের সামনে।

 

পাকিস্তানের জেএফ–১৭ থান্ডার যুদ্ধবিমানের এই সক্ষমতা ও প্রতিযোগিতামূলক দামের কারণে অত্যাধুনিক এই ফাইটার জেটটি ছোট দেশগুলোর নজরে আসে আরও আগেই। ২০১৫ সালে মিয়ানমার প্রথম দেশ হিসেবে জেএফ–১৭ ফাইটার জেট কিনেছিল। মোট ১৫টির মধ্যে এখন পর্যন্ত সাতটি ফাইটার জেট সরবরাহ করা হয়েছে। আর সামরিক জান্তার ওপর নিষেধাজ্ঞার কারণে বাকি যুদ্ধবিমানগুলো সরবরাহে দেরি হচ্ছে।

এছাড়া ২০২১ সালে নাইজেরিয়া তিনটি জেএফ–১৭ যুদ্ধবিমান কেনে। ২০২৪ সালের ফেব্রুয়ারিতে আজারবাইজান ১৬টি যুদ্ধবিমান কিনতে ১৫০ কোটি ডলারের চুক্তি করে। আর গত বছরের নভেম্বরে দেশটি বিজয় দিবসের কুচকাওয়াজে পাঁচটি জেএফ–১৭ যুদ্ধবিমান প্রদর্শন করে।

 

বিশ্লেষকদের মতে, গত বছরের মে মাসের যুদ্ধের পর, বিশেষ করে ভারতীয় রাফাল ফাইটার জেট ভূপাতিত হওয়ার পর জেএফ–১৭ যুদ্ধবিমানের চাহিদা ব্যাপকভাবে বেড়েছে।

 

ছয় দেশের সঙ্গে চুক্তি বা আলোচনা

 

চলতি বছরের ৬ জানুয়ারি পাকিস্তানের বিমান বাহিনীর প্রধান জাহির আহমদ বাবর সিধু ও বাংলাদেশের বিমান বাহিনীর প্রধান হাসান মাহমুদ খান ইসলামাবাদে বৈঠক করেন। সেখানে জেএফ–১৭ থান্ডার যুদ্ধবিমান কেনার সম্ভাবনা নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়।

 

পাকিস্তানের সামরিক বাহিনীর গণমাধ্যম শাখা আইএসপিআর জানিয়েছে, বাংলাদেশে জেএফ–১৭ থান্ডার যুদ্ধবিমান বিক্রির চুক্তি শিগগিরই চূড়ান্ত হতে যাচ্ছে।

 

এরপর গত সোমবার বার্তাসংস্থা রয়টার্স জানায়, ইন্দোনেশিয়ার প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইসলামাবাদে পাকিস্তানের বিমান বাহিনীর প্রধানের সঙ্গে বৈঠক করেছেন। আলোচনায় জেএফ–১৭ বিক্রির বিষয়টি ছিল। একটি সূত্র জানায়, জাকার্তা ৪০টিরও বেশি জেএফ-১৭ যুদ্ধবিমান কিনতে পারে।

ইরাকও এই যুদ্ধবিমান কেনার বিষয়ে ‘গভীর আগ্রহ’ দেখিয়েছে। এর এক মাসেরও কম সময় আগে লিবিয়ার জাতীয় সেনাবাহিনীর সঙ্গে ৪০০ কোটি ডলারের চুক্তি হয় পাকিস্তানের। এই চুক্তির আওতায় এক ডজনেরও বেশি জেএফ–১৭ যুদ্ধবিমান সরবরাহের কথা রয়েছে।

 

এছাড়া সৌদি আরবের দেয়া প্রায় ২০০ কোটি ডলারের ঋণকে জেএফ–১৭ যুদ্ধবিমান কেনার চুক্তিতে রূপান্তর করার বিষয়েও দুই দেশ আলোচনা চালাচ্ছে।

 

সাবেক এয়ার মার্শাল ও বিশ্লেষক আমির মাসুদ বলেন, পাকিস্তান অন্তত ছয়টি দেশের সঙ্গে জেএফ–১৭ যুদ্ধবিমানসহ বিভিন্ন প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম সরবরাহ নিয়ে চুক্তি করেছে বা আলোচনা চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে। তিনি সৌদি আরবের নাম উল্লেখ করলেও আলোচনার বিস্তারিত নিশ্চিত করেননি।

 

দ্য টেলিগ্রাফ বলছে, পাকিস্তান বর্তমানে ৭০০ কোটি ডলারের আইএমএফ কর্মসূচির আওতায় রয়েছে। ২০২৩ সালে ঋণখেলাপি এড়াতে নেয়া স্বল্পমেয়াদি ৩০০ কোটি ডলারের চুক্তির পর এই কর্মসূচির আওতায় আসে দেশটি। সৌদি আরব ও উপসাগরীয় মিত্রদের সহায়তায় এই কর্মসূচি নিশ্চিত হয়।

 

স্টিমসন সেন্টারের দক্ষিণ এশিয়া কর্মসূচির গবেষক ও নিউইয়র্কের অ্যালবানি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ক্রিস্টোফার ক্ল্যারি বলেন, জেএফ–১৭ যুদ্ধবিমান রপ্তানিতে পাকিস্তান বাস্তব সাফল্য পেয়েছে। প্রতিরক্ষা রপ্তানি শিল্প গড়ে তুলতে পারলে আন্তর্জাতিক অবস্থান ও বৈদেশিক মুদ্রা আয় যেমন বাড়বে, তেমনি এর পাশাপাশি নিজেদের প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম কেনাকাটায়ও সুবিধা হবে পাকিস্তানের।

 

এমন অবস্থায় গত সপ্তাহে পাকিস্তানের প্রতিরক্ষামন্ত্রী খাজা আসিফ বলেন, অস্ত্র শিল্পের এই সাফল্য দেশের অর্থনৈতিক চিত্রই পাল্টে দিতে পারে। তিনি জিও নিউজকে বলেন, ‘আমাদের বিমানগুলো (যুদ্ধক্ষেত্রে) পরীক্ষিত। বর্তমানে এতো এতো অর্ডার আসছে যে আগামী ছয় মাসের মধ্যে পাকিস্তানের আইএমএফের প্রয়োজনই নাও হতে পারে।’