ঢাকা ০৯:৪৯ পূর্বাহ্ন, শনিবার, ১০ জানুয়ারী ২০২৬, ২৭ পৌষ ১৪৩২ বঙ্গাব্দ

বিশ্ব থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়ার ঝুঁকিতে যুক্তরাষ্ট্র: বিবিসিকে কলম্বিয়ার প্রেসিডেন্ট

  • ডেস্ক রিপোর্টঃ
  • আপডেট সময় ০৭:৫৪:৪৮ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ৯ জানুয়ারী ২০২৬
  • ৫২৬ বার পড়া হয়েছে

 

ভেনেজুয়েলায় যুক্তরাষ্ট্রের হামলা এবং নিকোলাস মাদুরোকে আটক করার পর প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেছিলেন, কলম্বিয়াকে লক্ষ্য করে একটি সামরিক অভিযানের বিষয়টি ‘ভালো শোনাচ্ছে’। ট্রাম্প একাধিকবার পেত্রোকে ‘সাবধান থাকতে’ বলেছেন। এর প্রেক্ষিতে কলম্বিয়ার প্রেসিডেন্ট গুস্তাভো পেত্রো বিবিসিকে বলেছেন, তিনি বিশ্বাস করেন, এখন যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে কলম্বিয়ার বিরুদ্ধে সামরিক পদক্ষেপের একটি ‘বাস্তব হুমকি’ রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র অন্যান্য দেশকে তাদের ‘সাম্রাজ্যের’ অংশ হিসেবে দেখছে। যুক্তরাষ্ট্র ‘বিশ্বকে শাসন’ করা থেকে ‘বিশ্ব থেকে বিচ্ছিন্ন’ হয়ে যাওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছে।

 

ভেনেজুয়েলায় যা ঘটেছে, তা কলম্বিয়ায় পুনরাবৃত্তি হতে পারে কিনা কিংবা তিনি নিজের সরকার বা ঘনিষ্ঠ মহলে গুপ্তচর থাকার আশঙ্কা করেন কিনা- এমন প্রশ্নে তিনি অবশ্য সরাসরি মন্তব্য করেননি। গুস্তাভো পেত্রো অভিযোগ করে বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের ইমিগ্রেশন অ্যান্ড কাস্টমস এনফোর্সমেন্ট (আইসিই) এজেন্টরা ‘নাৎসি ব্রিগেডের’ মতো আচরণ করছে। অপরাধ ও অবৈধভাবে যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশ করা অভিবাসীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার অংশ হিসেবে ট্রাম্প আইসিই-এর কার্যক্রম উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়িয়েছেন।

ট্রাম্প ও পেত্রোর মধ্যে বুধবার সন্ধ্যায় ফোনালাপ হয়, এরপর ট্রাম্প বলেন, তিনি শিগগিরই হোয়াইট হাউসে কলম্বিয়ার প্রেসিডেন্টের সঙ্গে সাক্ষাৎ করবেন। বুধবার রাতে ট্রুথ সোশ্যাল প্ল্যাটফর্মে ট্রাম্প লিখেছেন, পেত্রোর সঙ্গে তার কথোপকথন ছিল ‘বিরাট সম্মান’। কলম্বিয়ার এক কর্মকর্তা তখন বলেন, আলোচনায় ‘উভয় পক্ষের বক্তব্যে’ ১৮০ ডিগ্রি পরিবর্তন লক্ষ্য করা গেছে। তবে বৃহস্পতিবার পেত্রোর বক্তব্যে বোঝা যায় সম্পর্কের উল্লেখযোগ্য উন্নতি হয়নি। তিনি বিবিসিকে বলেন, ফোনালাপটি প্রায় এক ঘণ্টার মতো স্থায়ী হয়েছিল, ‘যার বেশিরভাগ সময় আমি কথা বলেছি’ এবং আলোচনার বিষয়ের মধ্যে ছিল ‘কলম্বিয়ায় মাদক পাচার’, ভেনেজুয়েলা নিয়ে কলম্বিয়ার দৃষ্টিভঙ্গি এবং ‘লাতিন আমেরিকা জুড়ে যুক্তরাষ্ট্রকে ঘিরে যা ঘটছে’।

পেত্রো যুক্তরাষ্ট্রের সাম্প্রতিক অভিবাসন দমন কার্যক্রমের তীব্র সমালোচনা করেন, আইসিই এজেন্টদের বিরুদ্ধে ‘নাৎসি ব্রিগেডের’ মতো আচরণের অভিযোগ তোলেন। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প প্রায়ই যুক্তরাষ্ট্রে অপরাধ ও পাচারের জন্য অভিবাসনকে দায়ী করছেন এবং ব্যাপক অভিযানকে ন্যায্যতা দিতে এটি ব্যবহার করেছেন। তিনি কলম্বিয়া ও ভেনেজুয়েলার মতো দেশগুলোর বিরুদ্ধে মাদক পাচার রোধে যথেষ্ট পদক্ষেপ না নেওয়ার অভিযোগও করেছেন। প্রেসিডেন্ট হিসেবে হোয়াইট হাউসে ফেরার পর থেকে দেশজুড়ে শহরগুলোতে আইসিই এজেন্ট পাঠিয়েছেন ট্রাম্প। সংস্থাটি অভিবাসন আইন প্রয়োগ করে এবং অবৈধ অভিবাসন নিয়ে তদন্ত চালায়। এটি যুক্তরাষ্ট্র থেকে অবৈধ অভিবাসীদের বহিষ্কারের কাজও করে।

প্রশাসন জানিয়েছে, ২০২৫ সালের ২০ জানুয়ারি থেকে ১০ ডিসেম্বর পর্যন্ত তারা ছয় লাখ পাঁচ হাজার মানুষকে বহিষ্কার করেছে। এছাড়া তারা বলেছে, ১৯ লাখ অভিবাসী ‘স্বেচ্ছায় নিজ দেশে ফিরে গেছে’, যা ছিল গ্রেপ্তার বা আটক এড়াতে দেশ ছাড়ার জন্য চালানো আক্রমণাত্মক জনসচেতনতামূলক প্রচারণার ফল। সিরাকিউজ বিশ্ববিদ্যালয়ের ট্রানজ্যাকশনাল রেকর্ডস অ্যাক্সেস ক্লিয়ারিংহাউসের অভিবাসন প্রকল্পের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের ৩০শে নভেম্বর পর্যন্ত আইসিই-এর হেফাজতে ছিল প্রায় ৬৫ হাজার মানুষ। এই সপ্তাহে মিনিয়াপোলিস শহরে এক মার্কিন অভিবাসন এজেন্ট ৩৭ বছর বয়সী এক মার্কিন নাগরিককে গুলি করে হত্যা করেছে, যা রাতারাতি বিক্ষোভের জন্ম দেয়।

 

ফেডারেল কর্মকর্তারা বলেন, ওই নারী, রেনে নিকোল গুড, তার গাড়ি দিয়ে অভিবাসন এজেন্টদের চাপা দেওয়ার চেষ্টা করেছিলেন। তবে শহরের মেয়র, ডেমোক্র্যাট জ্যাকব ফ্রে বলেন, যে এজেন্ট তাকে গুলি করেছে সে বেপরোয়া আচরণ করেছে এবং তিনি এজেন্টদের শহর ছাড়ার দাবি জানান। পেত্রো বলেন, ‘আইসিই এখন এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যেখানে তারা শুধু রাস্তায় লাতিন আমেরিকানদের তাড়া করে না, যা আমাদের জন্য অপমানজনক, বরং তারা মার্কিন নাগরিকদেরও হত্যা করছে। যদি এটি চলতে থাকে, তাহলে বিশ্বকে শাসন করার একটি সাম্রাজ্যবাদী স্বপ্ন নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র বিশ্ব থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যাবে। বিচ্ছিন্ন হয়ে কোনো সাম্রাজ্য গড়ে ওঠেনি।’

পেত্রো বলেন, যুক্তরাষ্ট্র ‘দশকের পর দশক’ ধরে অন্যান্য সরকারকে, বিশেষ করে লাতিন আমেরিকায়, আইন উপেক্ষা করে ‘সাম্রাজ্যের’ অংশ হিসেবে দেখেছে। এই দুই নেতা দীর্ঘদিন ধরে প্রতিদ্বন্দ্বীর অবস্থানে আছেন, প্রায়ই সামাজিক মাধ্যমে অপমানজনক মন্তব্য ও শুল্কের হুমকি বিনিময় করেছেন। ভেনেজুয়েলায় যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক পদক্ষেপের পর পেত্রো অভিযোগ করেন, ওয়াশিংটন ‘তেল ও কয়লা’ নিয়ে যুদ্ধ চাচ্ছে। তিনি যোগ করেন, যদি যুক্তরাষ্ট্র প্যারিস চুক্তি থেকে বেরিয়ে না যেত—যেখানে দেশগুলো জীবাশ্ম জ্বালানি ব্যবহার কমিয়ে বৈশ্বিক তাপমাত্রা বৃদ্ধির সীমা নির্ধারণে সম্মত হয়েছিল- ‘তাহলে কোনো যুদ্ধ হতো না, বিশ্ব ও দক্ষিণ আমেরিকার সঙ্গে সম্পর্ক হতো অনেক বেশি গণতান্ত্রিক ও শান্তিপূর্ণ’। তিনি বলেন, ‘ভেনেজুয়েলা ইস্যুটি এ নিয়েই’।

 

ট্রাম্পের সামরিক পদক্ষেপের হুমকির মন্তব্যের পর কলম্বিয়াজুড়ে সার্বভৌমত্ব ও গণতন্ত্রের নামে বিক্ষোভ হয়েছে। পেত্রো বিবিসিকে বলেন, ট্রাম্পের মন্তব্য ছিল ‘বাস্তব হুমকি’। এ সময় তিনি উল্লেখ করেন যে কলম্বিয়া বিংশ শতকে পানামার মতো ভূখণ্ড হারিয়েছে। তিনি বলেন, এই হুমকি দূর করার সম্ভাবনা নির্ভর করছে চলমান আলোচনার ওপর।

 

যুক্তরাষ্ট্রের সম্ভাব্য হামলার ক্ষেত্রে কলম্বিয়া কীভাবে আত্মরক্ষা করবে—এমন প্রশ্নে পেত্রো বলেন, তিনি চান ‘এটি আলোচনার মাধ্যমে সমাধান হোক। তিনি জানান, এ নিয়ে কাজ চলছে। তবে তিনি যোগ করেন, কলম্বিয়ার ইতিহাস দেখায়, বড় সেনাবাহিনীর মোকাবিলায় আমরা কীভাবে প্রতিক্রিয়া জানিয়েছি। আমাদের হাতে বড় সেনাবাহিনীর মোকাবিলার অস্ত্র নেই। আমাদের কাছে এমনকি বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাও নেই। বরং আমরা নির্ভর করি জনগণ, আমাদের পাহাড় ও জঙ্গলের ওপর—যেমন সবসময় করেছি।

 

পেত্রো নিশ্চিত করেন, তিনি ভেনেজুয়েলার ভারপ্রাপ্ত প্রেসিডেন্ট ও সাবেক ভাইস প্রেসিডেন্ট এবং তেলমন্ত্রী ডেলসি রদ্রিগেজের সঙ্গেও কথা বলেছেন এবং তাকে কলম্বিয়ায় আমন্ত্রণ জানিয়েছেন। তিনি বলেন, ভেনেজুয়েলা দীর্ঘদিন ধরে বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থার হস্তক্ষেপের শিকার। এসব সংস্থাকে কলম্বিয়ায় কাজ করার অনুমতি দেওয়া হয়েছে কেবল মাদক পাচার মোকাবিলার জন্য। তিনি অভিযোগ করেন, অন্য গোপন অভিযান চালানোর চেষ্টা হয়েছে কলম্বিয়ায়।

মাদুরোকে আটক করে যুক্তরাষ্ট্রের সেনাবাহিনীর ডেল্টা ফোর্স, যা সামরিক বাহিনীর শীর্ষ সন্ত্রাসবিরোধী ইউনিট। ভেনেজুয়েলার সরকারের এক সিআইএ সূত্র যুক্তরাষ্ট্রকে তার অবস্থান শনাক্ত করতে সহায়তা করেছিল। বিশ্বের সবচেয়ে বড় কোকেন উৎপাদক দেশ হিসেবে কলম্বিয়া বৈশ্বিক মাদক বাণিজ্যের প্রধান কেন্দ্র। দেশটিতে উল্লেখযোগ্য তেল মজুদ রয়েছে, পাশাপাশি সোনা, রূপা, পান্না, প্লাটিনাম ও কয়লারও প্রাচুর্য আছে। যুক্তরাষ্ট্র বলেছে, তারা ভেনেজুয়েলার তেল বিক্রি ‘অনির্দিষ্টকালের জন্য’ নিয়ন্ত্রণ করবে, কারণ তারা বৈশ্বিক বাজারে দেশটির অপরিশোধিত তেলের ওপর বিধিনিষেধ শিথিলের প্রস্তুতি নিচ্ছে। ভেনেজুয়েলা অভিযানের পর এয়ার ফোর্স ওয়ানে ট্রাম্প পেত্রোকে বর্ণনা করেন ‘এক অসুস্থ মানুষ, যে কোকেন তৈরি করে এবং তা যুক্তরাষ্ট্রে বিক্রি করতে পছন্দ করে, সঙ্গে এটাও যোগ করেন, সে আর বেশি দিন এটা করতে পারবে না’।

পেত্রো অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, সবসময় প্রমাণিত হয়েছে আমি এতে জড়িত নই। তিনি বলেন, ২০ বছর ধরে আমি মাদক চক্রের বিরুদ্ধে লড়াই করছি, যার খেসারত হিসেবে আমার পরিবারকে নির্বাসনে যেতে হয়েছে।

 

সাবেক গেরিলা যোদ্ধা পেত্রো ক্ষমতায় আসার পর থেকে ‘সম্পূর্ণ শান্তি’র কৌশল অনুসরণ করছেন, যেখানে সশস্ত্র গোষ্ঠীর সঙ্গে আলোচনাকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে। সমালোচকরা বলেন, এই পদ্ধতি অতিরিক্ত নরম, যার ফলে কোকেন উৎপাদন রেকর্ড মাত্রায় পৌঁছেছে। কী ব্যর্থ হয়েছে এবং তিনি দায় স্বীকার করেন কি না–– এমন প্রশ্নে পেত্রো বলেন, কোকা চাষের বৃদ্ধি ধীর হচ্ছে এবং তিনি ‘দুটি সমান্তরাল পদ্ধতির’ কথা উল্লেখ করেন। একটি হলো শান্তি নিয়ে কথা বলা, যেসব গোষ্ঠী ডাকাত। আরেকটি হলো যারা শান্তি চায় না তাদের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযান চালানো। তিনি বলেন, দক্ষিণ কলম্বিয়ায় আলোচনা চলছে, যেখানে কোকা পাতার চাষ সবচেয়ে বেশি কমেছে এবং যেখানে কলম্বিয়ায় হত্যার হার সবচেয়ে বেশি কমেছে। কোকেন তৈরি হয় কোকা গাছের পাতা থেকে। তিনি বলেন, আলোচনার নীতি ‘সহিংসতা কমানোর’ জন্য। আমরা নির্বোধ নই, আমরা জানি কার সঙ্গে আলোচনা করছি।

জনপ্রিয় সংবাদ

নির্বাচনী প্রচারণাকে কেন্দ্র করে ভোলায় বিএনপি-জামায়াতের সংঘর্ষ, আহত ২০

বিশ্ব থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়ার ঝুঁকিতে যুক্তরাষ্ট্র: বিবিসিকে কলম্বিয়ার প্রেসিডেন্ট

আপডেট সময় ০৭:৫৪:৪৮ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ৯ জানুয়ারী ২০২৬

 

ভেনেজুয়েলায় যুক্তরাষ্ট্রের হামলা এবং নিকোলাস মাদুরোকে আটক করার পর প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেছিলেন, কলম্বিয়াকে লক্ষ্য করে একটি সামরিক অভিযানের বিষয়টি ‘ভালো শোনাচ্ছে’। ট্রাম্প একাধিকবার পেত্রোকে ‘সাবধান থাকতে’ বলেছেন। এর প্রেক্ষিতে কলম্বিয়ার প্রেসিডেন্ট গুস্তাভো পেত্রো বিবিসিকে বলেছেন, তিনি বিশ্বাস করেন, এখন যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে কলম্বিয়ার বিরুদ্ধে সামরিক পদক্ষেপের একটি ‘বাস্তব হুমকি’ রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র অন্যান্য দেশকে তাদের ‘সাম্রাজ্যের’ অংশ হিসেবে দেখছে। যুক্তরাষ্ট্র ‘বিশ্বকে শাসন’ করা থেকে ‘বিশ্ব থেকে বিচ্ছিন্ন’ হয়ে যাওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছে।

 

ভেনেজুয়েলায় যা ঘটেছে, তা কলম্বিয়ায় পুনরাবৃত্তি হতে পারে কিনা কিংবা তিনি নিজের সরকার বা ঘনিষ্ঠ মহলে গুপ্তচর থাকার আশঙ্কা করেন কিনা- এমন প্রশ্নে তিনি অবশ্য সরাসরি মন্তব্য করেননি। গুস্তাভো পেত্রো অভিযোগ করে বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের ইমিগ্রেশন অ্যান্ড কাস্টমস এনফোর্সমেন্ট (আইসিই) এজেন্টরা ‘নাৎসি ব্রিগেডের’ মতো আচরণ করছে। অপরাধ ও অবৈধভাবে যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশ করা অভিবাসীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার অংশ হিসেবে ট্রাম্প আইসিই-এর কার্যক্রম উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়িয়েছেন।

ট্রাম্প ও পেত্রোর মধ্যে বুধবার সন্ধ্যায় ফোনালাপ হয়, এরপর ট্রাম্প বলেন, তিনি শিগগিরই হোয়াইট হাউসে কলম্বিয়ার প্রেসিডেন্টের সঙ্গে সাক্ষাৎ করবেন। বুধবার রাতে ট্রুথ সোশ্যাল প্ল্যাটফর্মে ট্রাম্প লিখেছেন, পেত্রোর সঙ্গে তার কথোপকথন ছিল ‘বিরাট সম্মান’। কলম্বিয়ার এক কর্মকর্তা তখন বলেন, আলোচনায় ‘উভয় পক্ষের বক্তব্যে’ ১৮০ ডিগ্রি পরিবর্তন লক্ষ্য করা গেছে। তবে বৃহস্পতিবার পেত্রোর বক্তব্যে বোঝা যায় সম্পর্কের উল্লেখযোগ্য উন্নতি হয়নি। তিনি বিবিসিকে বলেন, ফোনালাপটি প্রায় এক ঘণ্টার মতো স্থায়ী হয়েছিল, ‘যার বেশিরভাগ সময় আমি কথা বলেছি’ এবং আলোচনার বিষয়ের মধ্যে ছিল ‘কলম্বিয়ায় মাদক পাচার’, ভেনেজুয়েলা নিয়ে কলম্বিয়ার দৃষ্টিভঙ্গি এবং ‘লাতিন আমেরিকা জুড়ে যুক্তরাষ্ট্রকে ঘিরে যা ঘটছে’।

পেত্রো যুক্তরাষ্ট্রের সাম্প্রতিক অভিবাসন দমন কার্যক্রমের তীব্র সমালোচনা করেন, আইসিই এজেন্টদের বিরুদ্ধে ‘নাৎসি ব্রিগেডের’ মতো আচরণের অভিযোগ তোলেন। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প প্রায়ই যুক্তরাষ্ট্রে অপরাধ ও পাচারের জন্য অভিবাসনকে দায়ী করছেন এবং ব্যাপক অভিযানকে ন্যায্যতা দিতে এটি ব্যবহার করেছেন। তিনি কলম্বিয়া ও ভেনেজুয়েলার মতো দেশগুলোর বিরুদ্ধে মাদক পাচার রোধে যথেষ্ট পদক্ষেপ না নেওয়ার অভিযোগও করেছেন। প্রেসিডেন্ট হিসেবে হোয়াইট হাউসে ফেরার পর থেকে দেশজুড়ে শহরগুলোতে আইসিই এজেন্ট পাঠিয়েছেন ট্রাম্প। সংস্থাটি অভিবাসন আইন প্রয়োগ করে এবং অবৈধ অভিবাসন নিয়ে তদন্ত চালায়। এটি যুক্তরাষ্ট্র থেকে অবৈধ অভিবাসীদের বহিষ্কারের কাজও করে।

প্রশাসন জানিয়েছে, ২০২৫ সালের ২০ জানুয়ারি থেকে ১০ ডিসেম্বর পর্যন্ত তারা ছয় লাখ পাঁচ হাজার মানুষকে বহিষ্কার করেছে। এছাড়া তারা বলেছে, ১৯ লাখ অভিবাসী ‘স্বেচ্ছায় নিজ দেশে ফিরে গেছে’, যা ছিল গ্রেপ্তার বা আটক এড়াতে দেশ ছাড়ার জন্য চালানো আক্রমণাত্মক জনসচেতনতামূলক প্রচারণার ফল। সিরাকিউজ বিশ্ববিদ্যালয়ের ট্রানজ্যাকশনাল রেকর্ডস অ্যাক্সেস ক্লিয়ারিংহাউসের অভিবাসন প্রকল্পের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের ৩০শে নভেম্বর পর্যন্ত আইসিই-এর হেফাজতে ছিল প্রায় ৬৫ হাজার মানুষ। এই সপ্তাহে মিনিয়াপোলিস শহরে এক মার্কিন অভিবাসন এজেন্ট ৩৭ বছর বয়সী এক মার্কিন নাগরিককে গুলি করে হত্যা করেছে, যা রাতারাতি বিক্ষোভের জন্ম দেয়।

 

ফেডারেল কর্মকর্তারা বলেন, ওই নারী, রেনে নিকোল গুড, তার গাড়ি দিয়ে অভিবাসন এজেন্টদের চাপা দেওয়ার চেষ্টা করেছিলেন। তবে শহরের মেয়র, ডেমোক্র্যাট জ্যাকব ফ্রে বলেন, যে এজেন্ট তাকে গুলি করেছে সে বেপরোয়া আচরণ করেছে এবং তিনি এজেন্টদের শহর ছাড়ার দাবি জানান। পেত্রো বলেন, ‘আইসিই এখন এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যেখানে তারা শুধু রাস্তায় লাতিন আমেরিকানদের তাড়া করে না, যা আমাদের জন্য অপমানজনক, বরং তারা মার্কিন নাগরিকদেরও হত্যা করছে। যদি এটি চলতে থাকে, তাহলে বিশ্বকে শাসন করার একটি সাম্রাজ্যবাদী স্বপ্ন নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র বিশ্ব থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যাবে। বিচ্ছিন্ন হয়ে কোনো সাম্রাজ্য গড়ে ওঠেনি।’

পেত্রো বলেন, যুক্তরাষ্ট্র ‘দশকের পর দশক’ ধরে অন্যান্য সরকারকে, বিশেষ করে লাতিন আমেরিকায়, আইন উপেক্ষা করে ‘সাম্রাজ্যের’ অংশ হিসেবে দেখেছে। এই দুই নেতা দীর্ঘদিন ধরে প্রতিদ্বন্দ্বীর অবস্থানে আছেন, প্রায়ই সামাজিক মাধ্যমে অপমানজনক মন্তব্য ও শুল্কের হুমকি বিনিময় করেছেন। ভেনেজুয়েলায় যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক পদক্ষেপের পর পেত্রো অভিযোগ করেন, ওয়াশিংটন ‘তেল ও কয়লা’ নিয়ে যুদ্ধ চাচ্ছে। তিনি যোগ করেন, যদি যুক্তরাষ্ট্র প্যারিস চুক্তি থেকে বেরিয়ে না যেত—যেখানে দেশগুলো জীবাশ্ম জ্বালানি ব্যবহার কমিয়ে বৈশ্বিক তাপমাত্রা বৃদ্ধির সীমা নির্ধারণে সম্মত হয়েছিল- ‘তাহলে কোনো যুদ্ধ হতো না, বিশ্ব ও দক্ষিণ আমেরিকার সঙ্গে সম্পর্ক হতো অনেক বেশি গণতান্ত্রিক ও শান্তিপূর্ণ’। তিনি বলেন, ‘ভেনেজুয়েলা ইস্যুটি এ নিয়েই’।

 

ট্রাম্পের সামরিক পদক্ষেপের হুমকির মন্তব্যের পর কলম্বিয়াজুড়ে সার্বভৌমত্ব ও গণতন্ত্রের নামে বিক্ষোভ হয়েছে। পেত্রো বিবিসিকে বলেন, ট্রাম্পের মন্তব্য ছিল ‘বাস্তব হুমকি’। এ সময় তিনি উল্লেখ করেন যে কলম্বিয়া বিংশ শতকে পানামার মতো ভূখণ্ড হারিয়েছে। তিনি বলেন, এই হুমকি দূর করার সম্ভাবনা নির্ভর করছে চলমান আলোচনার ওপর।

 

যুক্তরাষ্ট্রের সম্ভাব্য হামলার ক্ষেত্রে কলম্বিয়া কীভাবে আত্মরক্ষা করবে—এমন প্রশ্নে পেত্রো বলেন, তিনি চান ‘এটি আলোচনার মাধ্যমে সমাধান হোক। তিনি জানান, এ নিয়ে কাজ চলছে। তবে তিনি যোগ করেন, কলম্বিয়ার ইতিহাস দেখায়, বড় সেনাবাহিনীর মোকাবিলায় আমরা কীভাবে প্রতিক্রিয়া জানিয়েছি। আমাদের হাতে বড় সেনাবাহিনীর মোকাবিলার অস্ত্র নেই। আমাদের কাছে এমনকি বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাও নেই। বরং আমরা নির্ভর করি জনগণ, আমাদের পাহাড় ও জঙ্গলের ওপর—যেমন সবসময় করেছি।

 

পেত্রো নিশ্চিত করেন, তিনি ভেনেজুয়েলার ভারপ্রাপ্ত প্রেসিডেন্ট ও সাবেক ভাইস প্রেসিডেন্ট এবং তেলমন্ত্রী ডেলসি রদ্রিগেজের সঙ্গেও কথা বলেছেন এবং তাকে কলম্বিয়ায় আমন্ত্রণ জানিয়েছেন। তিনি বলেন, ভেনেজুয়েলা দীর্ঘদিন ধরে বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থার হস্তক্ষেপের শিকার। এসব সংস্থাকে কলম্বিয়ায় কাজ করার অনুমতি দেওয়া হয়েছে কেবল মাদক পাচার মোকাবিলার জন্য। তিনি অভিযোগ করেন, অন্য গোপন অভিযান চালানোর চেষ্টা হয়েছে কলম্বিয়ায়।

মাদুরোকে আটক করে যুক্তরাষ্ট্রের সেনাবাহিনীর ডেল্টা ফোর্স, যা সামরিক বাহিনীর শীর্ষ সন্ত্রাসবিরোধী ইউনিট। ভেনেজুয়েলার সরকারের এক সিআইএ সূত্র যুক্তরাষ্ট্রকে তার অবস্থান শনাক্ত করতে সহায়তা করেছিল। বিশ্বের সবচেয়ে বড় কোকেন উৎপাদক দেশ হিসেবে কলম্বিয়া বৈশ্বিক মাদক বাণিজ্যের প্রধান কেন্দ্র। দেশটিতে উল্লেখযোগ্য তেল মজুদ রয়েছে, পাশাপাশি সোনা, রূপা, পান্না, প্লাটিনাম ও কয়লারও প্রাচুর্য আছে। যুক্তরাষ্ট্র বলেছে, তারা ভেনেজুয়েলার তেল বিক্রি ‘অনির্দিষ্টকালের জন্য’ নিয়ন্ত্রণ করবে, কারণ তারা বৈশ্বিক বাজারে দেশটির অপরিশোধিত তেলের ওপর বিধিনিষেধ শিথিলের প্রস্তুতি নিচ্ছে। ভেনেজুয়েলা অভিযানের পর এয়ার ফোর্স ওয়ানে ট্রাম্প পেত্রোকে বর্ণনা করেন ‘এক অসুস্থ মানুষ, যে কোকেন তৈরি করে এবং তা যুক্তরাষ্ট্রে বিক্রি করতে পছন্দ করে, সঙ্গে এটাও যোগ করেন, সে আর বেশি দিন এটা করতে পারবে না’।

পেত্রো অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, সবসময় প্রমাণিত হয়েছে আমি এতে জড়িত নই। তিনি বলেন, ২০ বছর ধরে আমি মাদক চক্রের বিরুদ্ধে লড়াই করছি, যার খেসারত হিসেবে আমার পরিবারকে নির্বাসনে যেতে হয়েছে।

 

সাবেক গেরিলা যোদ্ধা পেত্রো ক্ষমতায় আসার পর থেকে ‘সম্পূর্ণ শান্তি’র কৌশল অনুসরণ করছেন, যেখানে সশস্ত্র গোষ্ঠীর সঙ্গে আলোচনাকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে। সমালোচকরা বলেন, এই পদ্ধতি অতিরিক্ত নরম, যার ফলে কোকেন উৎপাদন রেকর্ড মাত্রায় পৌঁছেছে। কী ব্যর্থ হয়েছে এবং তিনি দায় স্বীকার করেন কি না–– এমন প্রশ্নে পেত্রো বলেন, কোকা চাষের বৃদ্ধি ধীর হচ্ছে এবং তিনি ‘দুটি সমান্তরাল পদ্ধতির’ কথা উল্লেখ করেন। একটি হলো শান্তি নিয়ে কথা বলা, যেসব গোষ্ঠী ডাকাত। আরেকটি হলো যারা শান্তি চায় না তাদের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযান চালানো। তিনি বলেন, দক্ষিণ কলম্বিয়ায় আলোচনা চলছে, যেখানে কোকা পাতার চাষ সবচেয়ে বেশি কমেছে এবং যেখানে কলম্বিয়ায় হত্যার হার সবচেয়ে বেশি কমেছে। কোকেন তৈরি হয় কোকা গাছের পাতা থেকে। তিনি বলেন, আলোচনার নীতি ‘সহিংসতা কমানোর’ জন্য। আমরা নির্বোধ নই, আমরা জানি কার সঙ্গে আলোচনা করছি।