দীর্ঘ ১৭ বছরের নির্বাসন শেষে দেশে ফিরে বাংলাদেশের রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দুতে উঠে এসেছেন বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান। লন্ডনে নির্বাসিত জীবনের অবসান ঘটিয়ে গত ২৫ ডিসেম্বর ঢাকায় পা রাখার পর থেকেই সময় যেন দ্রুতগতিতে এগোচ্ছে তাঁর জন্য। বিমানবন্দরে তাঁকে স্বাগত জানাতে জড়ো হয় লাখো মানুষ। এর মাত্র পাঁচ দিনের মাথায় তাঁর মা, বাংলাদেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার মৃত্যু দেশজুড়ে শোক ও আবেগের আবহ তৈরি করে।
প্রভাবশালী মার্কিন ম্যাগাজিন টাইম-কে দেওয়া দেশে ফেরার পর প্রথম সাক্ষাৎকারে তারেক রহমান কথা বলেন ধীর ও সংযত কণ্ঠে। কারাবন্দী জীবনের স্মৃতি টেনে তিনি বলেন, শীত এলে এখনও পিঠে ব্যথা অনুভব করেন, যা ২০০৭–০৮ সালে সেনা-সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময় ১৮ মাস কারাবন্দী অবস্থায় নির্যাতনের ফল। মেরুদণ্ডের জটিলতার চিকিৎসার জন্য যুক্তরাজ্যে যাওয়া হলেও সেটিই পরবর্তী সময়ে দীর্ঘ রাজনৈতিক নির্বাসনে রূপ নেয় বলে উল্লেখ করা হয়েছে প্রতিবেদনে।
টাইমের প্রতিবেদনে বলা হয়, দেশে ফেরার পরপরই তারেক রহমানের সামনে এসেছে বড় রাজনৈতিক বাস্তবতা। আগামী ১২ ফেব্রুয়ারির জাতীয় নির্বাচনে তাঁর নেতৃত্বাধীন বিএনপিকে এগিয়ে রাখা হচ্ছে। সাম্প্রতিক জরিপে দলটির সমর্থন প্রায় ৭০ শতাংশে পৌঁছেছে বলে দাবি করা হয়েছে। শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগ ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর এই নির্বাচন অনুষ্ঠিত হচ্ছে, যেখানে প্রাণ গেছে প্রায় দেড় হাজার মানুষের।
সাক্ষাৎকারে তারেক রহমান নিজেকে তুলে ধরেছেন এক ধরনের সেতুবন্ধন হিসেবে—একদিকে মুক্তিযুদ্ধ-পরবর্তী রাজনৈতিক উত্তরাধিকার, অন্যদিকে জেন-জেড প্রজন্মের প্রত্যাশা। তিনি বলেন, ‘আমি এখানে এসেছি শুধু বাবা-মায়ের সন্তান হিসেবে নয়; আমার দলের কর্মী-সমর্থকেরাই আমাকে এখানে এনেছেন।’
প্রতিবেদনে বিএনপির ২০০১–০৬ মেয়াদের শাসনামলে দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণে দুর্বলতার কথাও উল্লেখ করা হয়েছে। তবে নিজের বিরুদ্ধে ওঠা দুর্নীতির অভিযোগ অস্বীকার করে তারেক রহমান বলেন, এসব অভিযোগের পক্ষে কেউই কিছু প্রমাণ করতে পারেনি।
বাংলাদেশের বর্তমান অর্থনৈতিক পরিস্থিতিকে কঠিন আখ্যা দিয়ে প্রতিবেদনে উচ্চ মূল্যস্ফীতি, দুর্বল মুদ্রা ও বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ হ্রাসের কথা তুলে ধরা হয়। প্রতিবছর প্রায় ২০ লাখ তরুণ শ্রমবাজারে প্রবেশ করলেও যুব বেকারত্ব ১৩ শতাংশের বেশি—এই বাস্তবতায় পরিকল্পনাভিত্তিক রাজনীতির ওপর জোর দেন তারেক রহমান।
টাইমকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে তিনি ১২ হাজার মাইল খাল খনন, বছরে ৫ কোটি গাছ লাগানো, ঢাকায় নতুন সবুজ এলাকা সৃষ্টি, বর্জ্য থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদন, প্রবাসী কর্মীদের দক্ষতা বাড়াতে কারিগরি শিক্ষার সংস্কার এবং বেসরকারি হাসপাতালের সঙ্গে অংশীদারত্বে স্বাস্থ্যখাত উন্নয়নের প্রস্তাব দেন। তিনি বলেন, ‘আমার পরিকল্পনার ৩০ শতাংশ বাস্তবায়ন করতে পারলেই মানুষ আমাকে সমর্থন করবে।’
আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও বাংলাদেশ গুরুত্বপূর্ণ এক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে—রোহিঙ্গা সংকট, যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের ভূরাজনৈতিক আগ্রহ এবং ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্ক আগামী সরকারের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হবে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়। যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্য ঘাটতি কমানো ও সম্পর্ক উন্নয়নের কথা বললেও ভারতের সঙ্গে সম্পর্কের ক্ষেত্রে সতর্ক ও বাস্তববাদী অবস্থান তুলে ধরেন তারেক রহমান।
দেশে আইনশৃঙ্খলার অবনতি, মব সহিংসতা, সংখ্যালঘু ও নারীদের ওপর হামলা এবং জামায়াতে ইসলামীর উত্থান নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেন তিনি। তারেক রহমান বলেন, ‘আমাদের প্রথম অগ্রাধিকার হবে আইনের শাসন নিশ্চিত করা—মানুষ যেন রাস্তায় ও ব্যবসায় নিরাপদ থাকে।’
ব্যক্তিজীবন প্রসঙ্গে টাইম লিখেছে, তারেক রহমান অন্তর্মুখী মানুষ। লন্ডনে তাঁর সময় কাটত রিচমন্ড পার্কে হাঁটাহাঁটি আর ইতিহাসের বই পড়ে। প্রিয় সিনেমা ‘এয়ার ফোর্স ওয়ান’—যা তিনি আটবার দেখেছেন। দেশে ফেরার পর কাঁটাতারের নিরাপত্তা ও চলাচলের বিধিনিষেধে তাঁর ব্যক্তিগত স্বাধীনতা কমেছে বলেও জানান তিনি। তাঁর ভাষায়, ‘স্বাধীনতাটাই সবচেয়ে বেশি মিস করি।’



















