এবার মধ্যপ্রাচ্যে চলমান সংঘাত এখন আর কেবল স্থল বা আকাশসীমার লড়াইয়ে সীমাবদ্ধ নেই; এটি রূপ নিয়েছে এক জটিল গাণিতিক যুদ্ধে। একদিকে ইরানের ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্রের বিশাল মজুত, আর অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র, ইসরায়েল ও উপসাগরীয় মিত্রদের আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থার সক্ষমতা। এই দুইয়ের ভারসাম্যই এখন যুদ্ধের গতিপথ নির্ধারণ করছে। যুদ্ধের বর্তমান ধাপে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের প্রধান লক্ষ্য হলো— ইরানের সামরিক সক্ষমতা ভঙ্গুর করে দেওয়া। তারা সুনির্দিষ্টভাবে ইরানের ক্ষেপণাস্ত্রের মজুত, উৎক্ষেপণকেন্দ্র, অস্ত্রাগার এবং সামরিক অবকাঠামোগুলোকে লক্ষ্যবস্তু বানাচ্ছে। ওয়াশিংটনের সেন্টার ফর আ নিউ আমেরিকান সিকিউরিটির প্রতিরক্ষা কর্মসূচির পরিচালক স্ট্যাসি পেটিজন এই পরিস্থিতিকে কৌশলগত পাল্লা দেওয়ার লড়াই হিসেবে অভিহিত করেছেন। অর্থাৎ, প্রতিপক্ষ একে অপরের ওপর একসঙ্গে প্রচুর নিখুঁত হামলা করছে, যাতে প্রতিরক্ষাব্যবস্থা ভেদ করা যায়।
গত শনিবার থেকে ইরান এবং তাদের মিত্র গোষ্ঠীগুলো পাল্টা জবাব দিতে শুরু করেছে। প্রায় ১ হাজার ২০০ মাইল এলাকাজুড়ে বিস্তৃত এক ডজন দেশের বিভিন্ন লক্ষ্যবস্তুতে তারা এক হাজারের বেশি হামলা চালিয়েছে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর মধ্যপ্রাচ্যে এটিই সবচেয়ে বড় ভৌগোলিক বিস্তৃতির সংঘাত। তবে ইরানের বিমানবাহিনী ইসরায়েল বা যুক্তরাষ্ট্রের তুলনায় বেশ দুর্বল। ফলে তেহরানকে পুরোপুরি নির্ভর করতে হচ্ছে তাদের ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোনের ওপর। যদিও ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধবিমান ইরানের শত শত লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হেনেছে, তবুও এখন পর্যন্ত তাদের কোনো উড়োজাহাজ ভূপাতিত করতে পারেনি ইরান।
ইরানের রেড ক্রিসেন্টের তথ্যমতে, চলমান সংঘাতে দেশটিতে ৭৮৭ জনেরও বেশি মানুষ নিহত হয়েছেন। বিশ্লেষকদের ধারণা, শীর্ষ কমান্ডারদের মৃত্যু এবং চেইন অব কমান্ডে বিশৃঙ্খলার কারণে ইরান এখন সুসংগঠিত হামলার বদলে বিচ্ছিন্নভাবে যখন যা সম্ভব নীতিতে হামলা চালাচ্ছে। এই যুদ্ধ ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়েছে উপসাগরীয় দেশগুলোতে। ইরান ও তাদের মিত্ররা কাতার, কুয়েত, ইরাক, বাহরাইন, ওমান ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের মার্কিন সামরিক ও বেসামরিক অবকাঠামো লক্ষ্য করে হামলা চালিয়েছে। দুবাইয়ের বিলাসবহুল হোটেল, সৌদি আরবের তেল অবকাঠামো এবং সাইপ্রাসে ব্রিটিশ ঘাঁটিতেও ড্রোন হামলার ঘটনা ঘটেছে।
তবে উপসাগরীয় দেশগুলো তাদের আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থার সাফল্যের দাবি করেছে। সংযুক্ত আরব আমিরাত জানিয়েছে, তাদের দিকে ছোড়া ১৭৪টি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রের মধ্যে ১৬১টি এবং ৬৮৯টি ড্রোনের মধ্যে ৬৪৫টি সফলভাবে ধ্বংস করা হয়েছে। কাতারের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, তারা একাধিক ইরানি যুদ্ধবিমান, ৩টি ক্রুজ মিসাইল এবং ৯৮টি ব্যালিস্টিক মিসাইল ভূপাতিত করেছে। বিশ্লেষকদের মতে, এই যুদ্ধের স্থায়িত্ব নির্ভর করছে অস্ত্রের মজুত ও ব্যয়ের ওপর। ওয়াশিংটনের স্টিমসন সেন্টারের বিশ্লেষক কেলি গ্রিয়েকো জানান, একটি ড্রোন তৈরি করতে যা খরচ হয়, তা ধ্বংস করতে আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থায় তার চেয়ে পাঁচ গুণ বেশি অর্থ ব্যয় করতে হয়। এটি ইরানের জন্য একটি কার্যকর কৌশল, যারা যুদ্ধ দীর্ঘায়িত করে শত্রুপক্ষকে অর্থনৈতিকভাবে দুর্বল করতে চায়।
ইসরায়েলভিত্তিক মিসাইল ডিফেন্স অ্যাডভাইজরি অ্যালায়েন্স–এর জ্যেষ্ঠ গবেষণা ফেলো তাল ইনবার বলেন, শতভাগ নিশ্ছিদ্র প্রতিরক্ষাব্যবস্থা বলে কিছু নেই। একটিমাত্র ক্ষেপণাস্ত্রও যদি কোনো হাসপাতাল বা বিদ্যুৎকেন্দ্রে আঘাত হানে, তবে তার খেসারত হবে ভয়াবহ। বিশ্লেষকরা মনে করছেন, যুদ্ধের এই পর্যায়ে টিকে থাকার সক্ষমতাই আসল। যুক্তরাষ্ট্রের অত্যাধুনিক অস্ত্রের মজুত সীমিত এবং ইউক্রেন বা তাইওয়ানের মতো ফ্রন্টেও এর চাহিদা রয়েছে। স্ট্যাসি পেটিজনের মতে, আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থার মজুত ফুরিয়ে এলেই কেবল ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্র আক্রমণাত্মক অবস্থান থেকে সরে এসে সমঝোতার পথে হাঁটতে পারে। তবে আপাতত উপসাগরীয় দেশগুলোই সবচেয়ে বড় ক্ষতির মুখে রয়েছে এবং ইরান সম্ভবত তাদের মজুত ফুরিয়ে গেলে সময়ক্ষেপণের জন্য শান্তির প্রস্তাব দিতে পারে। জেরুজালেমের আকাশে সাইরেন আর বিস্ফোরণের শব্দ এবং ইরানের ধ্বংসস্তূপ; সব মিলিয়ে মধ্যপ্রাচ্যের আকাশ এখন বারুদের গন্ধে ভারী, যেখানে প্রতিটি ক্ষেপণাস্ত্রের হিসাবনিকাশে নির্ধারণ হবে আগামী দিনের ভবিষ্যৎ। সূত্র : দ্য গার্ডিয়ান


















