এবার ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনী (আইআরজিসি) জানিয়েছে, ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র–ইসরায়েলের অযৌক্তিক আগ্রাসনে শীর্ষ নিরাপত্তা কর্মকর্তা ড. আলী লারিজানিকে হত্যার প্রতিশোধ হিসেবে তেল আবিবে ১০০ টিরও বেশি লক্ষ্যবস্তুতে হামলা চালানো হয়েছে। এ ছাড়া, ইসরায়েলের অন্তত ৫টি বিদ্যুৎকেন্দ্রে হামলা চালানোর পরিকল্পনা করছে ইরান। ইরানের রাষ্ট্রীয় সম্প্রচারমাধ্যম প্রেস টিভির খবরে বলা হয়েছে, আজ বুধবার এক বিবৃতিতে আইআরজিসি জানায়—চলমান প্রতিশোধমূলক অভিযান ‘অপারেশন ট্রু প্রমিজ–৪ ’—এর ৬১ তম ধাপে এসব লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানা হয়। বিবৃতিতে বলা হয়, একাধিক ওয়ারহেডযুক্ত খোররামশাহর–৪ ও গদর ক্ষেপণাস্ত্রের পাশাপাশি এমাদ ও খেইবার শেকান প্রজেক্টাইল ব্যবহার করে এসব শত্রু লক্ষ্যবস্তু ধ্বংস করা হয়েছে।
বিবৃতিতে আরও বলা হয়, ‘এটি ছিল ইরানের সর্বোচ্চ জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদের (এসএনএসসি) সাবেক সচিব ড. লারিজানির শাহাদাতের প্রতিশোধ নেওয়ার অংশ।’ এতে বলা হয়, ‘এই তীব্র বজ্রগতির হামলার সময় খোররামশাহর–৪ ও গদর ক্ষেপণাস্ত্র দখলকৃত ভূখণ্ডের কেন্দ্রস্থলে থাকা ১০০ টির বেশি সামরিক ও নিরাপত্তা লক্ষ্যবস্তুতে কোনো বাধা ছাড়াই আঘাত হানে।’ আইআরজিসি দাবি করে, প্রতিশোধের এই পর্যায়ের সফলতার কারণ ছিল ‘জায়নিস্ট শাসনের বহুস্তরীয় ও অত্যাধুনিক আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার ভেঙে পড়া।’ মাঠপর্যায়ের তথ্যের উদ্ধৃতি দিয়ে তারা জানায়, এই হামলার ফলে তেল আবিবে আংশিক বিদ্যুৎ বিভ্রাট ঘটে এবং পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ ও ক্ষতিগ্রস্তদের উদ্ধার করতে দখলদার বাহিনীর কঠিন সময় পার করতে হয়।
আইআরজিসি আরও জানায়, অপারেশন ট্রু প্রমিজ ৪ এ পর্যন্ত ২৩০ জনের বেশি জায়োনিস্টকে হতাহত করেছে। ওয়াশিংটন ও তেল আবিবের সাম্প্রতিক তথাকথিত অবৈধ আগ্রাসনের জবাব হিসেবেই এই প্রতিশোধমূলক হামলা শুরু হয় বলে দাবি করা হয়েছে। তেল আবিবের পাশাপাশি দখলকৃত পবিত্র নগরী আল–কুদস, দখলকৃত বন্দরনগরী হাইফা, প্রযুক্তিগত কেন্দ্র হিসেবে পরিচিত বেয়ার শেভা এবং নেগেভ মরুভূমিতেও কৌশলগত ও সংবেদনশীল লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানা হয়েছে। এ ছাড়া কাতার, বাহরাইন, সংযুক্ত আরব আমিরাত, কুয়েত ও সৌদি আরবসহ অঞ্চলে থাকা মার্কিন ঘাঁটিগুলোও তীব্র প্রতিশোধমূলক হামলার মুখে পড়েছে।
অপরদিকে, ইসরায়েলের মোট বিদ্যুতের অর্ধেকেরও বেশি উৎপাদনকারী পাঁচটি বড় বিদ্যুৎকেন্দ্রকে সম্ভাব্য লক্ষ্যবস্তু হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে। তেহরানের শাহাদা স্কয়ার এলাকায় বিদ্যুৎ স্থাপনায় ইসরায়েলি হামলার প্রতিশোধ হিসেবে ইরানের সম্ভাব্য জবাব নিয়ে নানা বিশ্লেষণ ও প্রস্তাব প্রকাশিত হয়েছে। বিভিন্ন সূত্র দখলকৃত ভূখণ্ডের প্রধান বিদ্যুৎ উৎপাদন অবকাঠামো পর্যালোচনা করেছে। ইসরায়েলের প্রধান পাঁচটি প্রধান তাপবিদ্যুৎকেন্দ্র রয়েছে—
১. ওরোট রবিন স্টিম পাওয়ার প্ল্যান্ট: ২ হাজার ৫৯০ মেগাওয়াট ক্ষমতাসম্পন্ন এই কেন্দ্রটি হাদেরা এলাকার কাছে অবস্থিত এবং এটি ইসরায়েলের বৃহত্তম তাপবিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর একটি। ১৯৮২ সালে স্থাপিত এই কেন্দ্রটি ইসরায়েল ইলেকট্রিক করপোরেশনের মালিকানাধীন।
২. রুটেনবার্গ স্টিম পাওয়ার প্ল্যান্ট: ২ হাজার ২৫০ মেগাওয়াট ক্ষমতার এই কেন্দ্রটি আশকেলনের কাছে অবস্থিত। ১৯৯০ সালে প্রতিষ্ঠিত এই কেন্দ্রটিও ইসরায়েল ইলেকট্রিক করপোরেশনের মালিকানাধীন।
৩. হাগিত কম্বাইন্ড সাইকেল পাওয়ার প্ল্যান্ট: ১ হাজার ৩৭১ মেগাওয়াট ক্ষমতার এই কেন্দ্রটি দখলকৃত ভূখণ্ডের উত্তরাংশে ইয়োকনিয়ামের কাছে অবস্থিত। ২০০২ সালে চালু হওয়া এই কেন্দ্রটিও ইসরায়েল ইলেকট্রিক করপোরেশন পরিচালনা করে।
৪. এশকোল হাইব্রিড পাওয়ার প্ল্যান্ট: ৯১২ মেগাওয়াট ক্ষমতার এই কেন্দ্রটি আশদোদের কাছে অবস্থিত এবং ১৯৭৪ সাল থেকে চালু রয়েছে।
৫. হারুভিত (এতসাফিত) পাওয়ার প্ল্যান্ট: ৯০০ মেগাওয়াট ক্ষমতার এই কেন্দ্রটি কিরিয়াত মালাখির কাছে অবস্থিত। ২০১৫ সাল থেকে চালু থাকা এই কেন্দ্রটির মালিকানা বেসরকারি প্রতিষ্ঠান ডালিয়া পাওয়ার এনার্জিজের হাতে।
এই পাঁচটি বিদ্যুৎকেন্দ্র মিলেই দখলকৃত ভূখণ্ডে মোট বিদ্যুতের ৫০ শতাংশের বেশি উৎপাদন করে। এসব কেন্দ্রের কার্যক্রমে সামান্য বিঘ্ন ঘটলেও পুরো বিদ্যুৎ গ্রিডে প্রভাব পড়বে। তবে এ ধরনের বিষয় মোকাবিলায় সম্ভাব্য প্রতিক্রিয়ার ক্ষেত্রে প্রযুক্তিগত, অর্থনৈতিক ও নিরাপত্তাগত দিকগুলো সতর্কতার সঙ্গে মূল্যায়ন করা প্রয়োজন বলে উল্লেখ করা হয়েছে।


















