চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী ব্রাজিল ও আর্জেন্টিনার লড়াইয়ে আবেগ ছাপিয়ে প্রায়ই চলে আসে অতীতের সাফল্যের পরিসংখ্যান। মাঠের লড়াইয়ের পাশাপাশি দুই দেশের সমর্থকদের মধ্যেও চলে তর্ক–বিতর্ক, খোঁচা আর শ্রেষ্ঠত্বের লড়াই। নিজেদের অবস্থান শক্ত করতে তারা প্রায়ই অতীতের সাফল্য, স্মরণীয় ম্যাচ এবং ফুটবল ইতিহাসের নানা অধ্যায় সামনে নিয়ে আসে। ফলে ব্রাজিল–আর্জেন্টিনা দ্বৈরথ শুধু একটি ফুটবল ম্যাচ নয়, বরং ইতিহাস, গৌরব ও আবেগের এক দীর্ঘ প্রতিযোগিতা। ব্রাজিল ও আর্জেন্টিনার সমর্থকদের মধ্যে খোঁচাখুঁচির অন্যতম বিষয় হলো অতীতের ইতিহাস। একে অপরকে উদ্দেশ্য করে অনেক সমর্থকই বলে থাকেন, প্রতিপক্ষ দল নাকি শুধু ‘বাপ–দাদার ইতিহাস’ নিয়েই পড়ে থাকে। তবে আর্জেন্টিনার ফুটবল ইতিহাসের পাতা উল্টালে বিতর্কিত কিছু অধ্যায়ও সামনে আসে। এর মধ্যে সবচেয়ে আলোচিত বিষয়গুলোর একটি হলো তাদের প্রথম বিশ্বকাপ শিরোপা জয়কে ঘিরে ওঠা ম্যাচ পাতানোর অভিযোগ। বিশেষ করে সেই আসরের কিছু ম্যাচের ফলাফল নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে ফুটবল অঙ্গনে বিতর্ক ও প্রশ্নের জন্ম হয়েছে, যা আজও আলোচনার বিষয় হয়ে রয়েছে।
কেন বিতর্কিত ১৯৭৮ সালের বিশ্বকাপ? ১৯৭৬ সালে সামরিক অভ্যুত্থানের মাধ্যমে জেনারেল হোর্হে রাফায়েল বিদেলা আর্জেন্টিনার ক্ষমতায় বসেন। সেই শাসনামলে দেশটিতে ‘ডার্টি ওয়ার’ নামে এক অন্ধকার অধ্যায় চলছিল। সমালোচকদের মতে, সামরিক সরকার ১৯৭৮ সালের বিশ্বকাপকে নিজেদের ভাবমূর্তি উজ্জ্বল করার একটি রাজনৈতিক অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করেছিল। ফুটবল বিশ্বজুড়ে আজও সেই আসরের ফলাফল নিয়ে প্রশ্ন ওঠে, যা আর্জেন্টিনা সমর্থকদের ‘বাপ–দাদার আমলের ইতিহাস’ নিয়ে গালভরা গল্পের সত্যতা নিয়ে সন্দেহের উদ্রেক করে।
পেরুর বিপক্ষে ৬–০ গোলের জয় ও ষড়যন্ত্রের গুঞ্জন- সেই আসরের সবচেয়ে বিতর্কিত মুহূর্ত ছিল আর্জেন্টিনার সেমিফাইনাল পর্যায়ের ম্যাচটি। ফাইনালে ওঠার জন্য আর্জেন্টিনার প্রয়োজন ছিল পেরুর বিপক্ষে অন্তত ৪ গোলের ব্যবধানে জয়। অদ্ভুতভাবে, সেই ম্যাচে আর্জেন্টিনা ৬–০ গোলের বড় জয় পায়। পরবর্তীতে ফুটবল বিশ্বে অভিযোগ ওঠে যে, রাজনৈতিক প্রভাব বা পর্দার আড়ালের সমঝোতার মাধ্যমেই ম্যাচটির ফল নির্ধারণ করা হয়েছিল। পেরুর গোলরক্ষকের অদক্ষ পারফরম্যান্স এবং রক্ষণভাগের নড়বড়ে অবস্থা আজও ফুটবল বোদ্ধাদের কাছে সন্দেহের বড় কারণ।
অন্যান্য বিতর্ক ও নেদারল্যান্ডসের ফাইনাল- টুর্নামেন্টের সময়সূচি নিয়ে ব্রাজিল শুরু থেকেই অসন্তোষ প্রকাশ করেছিল। তাদের অভিযোগ ছিল, আর্জেন্টিনার সুবিধার্থে সূচি এমনভাবে সাজানো হয়েছিল যা তাদের ফাইনালে ওঠার পথ সহজ করে দেয়। পাশাপাশি, নেদারল্যান্ডসের কিংবদন্তি ফুটবলার ইয়োহান ক্রুইফ সেই বিশ্বকাপে নিরাপত্তা ও রাজনৈতিক চাপের ভয়ে অংশগ্রহণ করেননি, যা আর্জেন্টিনা শিবিরে বাড়তি সুবিধা দিয়েছিল বলে প্রচলিত ধারণা রয়েছে। ফাইনালে নেদারল্যান্ডসের বিপক্ষে অতিরিক্ত সময়ে ৩–১ ব্যবধানে জয়লাভ করে আর্জেন্টিনা।
ব্রাজিল বনাম আর্জেন্টিনা: ইতিহাসের কাঠগড়ায়- ব্রাজিল ও আর্জেন্টিনা সমর্থকদের তর্ক–বিতর্কে যখন অতীতের সাফল্য নিয়ে শ্রেষ্ঠত্বের লড়াই চলে, তখন ব্রাজিল সমর্থকরা সরাসরিই বলে বসেন—যে বিশ্বকাপ অর্জনের ভিত্তিই ছিল ম্যাচ পাতানো ও রাজনৈতিক ষড়যন্ত্র, সেই বিশ্বকাপ নিয়ে গর্ব করার কিছু নেই। মাঠের ফুটবলের নৈপুণ্য ছাপিয়ে মাঠের বাইরের রাজনীতি ও বিতর্কিত ঘটনাগুলো এই বিশ্বকাপকে আজ এক ‘কলঙ্কিত’ ট্রফি হিসেবেই চিহ্নিত করে রেখেছে। ফলে, ক্ষমতা, রাজনীতি ও ক্রীড়ার জটিল সমীকরণের এই বিশ্বকাপ জয় নিয়ে আর্জেন্টিনা সমর্থকদের ‘গর্বের গল্প’ ব্রাজিল সমর্থকদের কাছে কেবলই এক বিতর্কিত অধ্যায় হিসেবে গণ্য হয়।





















