এবার শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীদের প্রাণের দাবি শাকসু নির্বাচন বন্ধের সিদ্ধান্ত হলে বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবির সাধারণ শিক্ষার্থীদের নিয়ে দেশব্যাপী কঠোর ও লাগাতার কর্মসূচি দিতে বাধ্য হবে বলে জানিয়েছেন সংগঠনটির সভাপতি নুরুল ইসলাম সাদ্দাম। তিনি বলেন, কোনো রাজনৈতিক চাপ, হুমকি কিংবা পেশিশক্তির কাছে নতি স্বীকার করে নির্বাচন প্রক্রিয়াকে বিঘ্ন ঘটানো হলে তা কোনোভাবেই বরদাস্ত করা হবে না। আজ সোমবার (১৯ জানুয়ারি) দুপুরে রাজধানীর পুরানা পল্টনে কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে ‘নির্ধারিত সময়ে শাকসু বাস্তবায়নের দাবি’তে অনুষ্ঠিত সংবাদ সম্মেলনে একথা বলেন তিনি।
নুরুল ইসলাম সাদ্দাম বলেন, শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালযয়ের দীর্ঘ প্রতীক্ষিত কেন্দ্রীয় শিক্ষার্থী সংসদ অর্থাৎ শাকসু নির্বাচন আগামী ২০ জানুয়ারি। বিশ্ববিদ্যালয়টির ৯ হাজার শিক্ষার্থীর প্রাণের দাবি শাকসু নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে। এ নির্বাচনকে সামনে রেখে প্রতিটি প্যানেল ও প্রার্থীরা যখন সাধারণ শিক্ষার্থীদের দ্বারে দ্বারে যাচ্ছেন, শিক্ষার্থীদের মধ্যে ব্যাপক নির্বাচনী আমেজ কাজ করছে এবং প্রশাসন যখন নির্বাচনের শেষ মুহূর্তের সব প্রস্তুতি সম্পন্ন করেছে, ঠিক তখনই একটি মহল পেশিশক্তির মাধ্যমে এ নির্বাচনকে বাধাগ্রস্ত করতে পাঁয়তারা করছে।
তিনি বলেন, জুলাই গণঅভ্যুত্থান পরবর্তী বাংলাদেশের ছাত্রসমাজের সবচেয়ে বড় আকাঙ্ক্ষার বিষয় ছিল প্রতিটি ক্যাম্পাসেই শিক্ষার্থীদের প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করা এবং সে লক্ষ্যে ক্যাম্পাসে নিয়মিত ও কার্যকর ছাত্র সংসদ নির্বাচনের আয়োজন করা। ছাত্র সংসদ নির্বাচন শিক্ষার্থীদের মৌলিক গণতান্ত্রিক একটি অধিকার। ক্যাম্পাসে গতানুগতিক ছাত্র রাজনীতির নেতিবাচক ধারা সংস্কার করে শিক্ষার্থীদের প্রকৃত প্রতিনিধিত্বমূলক ও কল্যাণমুখী নেতৃত্ব বিকাশে ছাত্রসংসদ এক অনন্য ভূমিকা পালন করে। সম্প্রতি দেশের পাঁচটি বিশ্ববিদ্যালয়ে অনুষ্ঠিত ছাত্রসংসদ নির্বাচনে ছাত্র সংসদের ইতিবাচক ফল আমরা দেখতে পাচ্ছি। নির্বাচিত প্রতিনিধিরা থাকার কারণে ওই ক্যাম্পাসের আবাসন সংকট নিরসন পরিবহন সমস্যার সমাধান, মাদক ও বহিরাগতমুক্ত নিরাপদ পরিবেশ নিশ্চিত করা, পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন কার্যক্রম, ডাইনিং এর খাবারের মানের উন্নয়ন এবং একটি স্বাস্থ্যসম্মত ও বাসযোগ্য হলের পরিবেশ নিশ্চিত করতে ব্যাপকভিত্তিক কাজ পরিলক্ষিত হচ্ছে। তাছাড়া সাধারণ শিক্ষার্থীদের স্বাস্থ্য সেবা লাইব্রেরিতে পাঠ পরিবেশকে আধুনিক ও শিক্ষার্থীবান্ধব করা দক্ষতা উন্নয়ন এবং মেধার বিকাশে নানাবিধ ছাত্রকল্যাণমূলক কার্যক্রম শুরু হয়েছে। যা এর আগে বাংলাদেশের যতগুলো ছাত্র সংসদ নির্বাচন হয়েছে সেখানে এমন গঠনমূলক কার্যক্রম আমরা দেখতে পাইনি।
এই ধারাবাহিকতায় শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় সচেতন শিক্ষার্থীরাও তাদের কাঙ্ক্ষিত প্রতিনিধিত্ব নির্বাচন করতে এবং ক্যাম্পাসের সহবস্থানের পরিবেশ ফিরিয়ে আনতে বদ্ধপরিকর। তাদের প্রবল দাবির পরিপ্রেক্ষিতে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন শাকসু নির্বাচন আয়োজন করতে বাধ্য হয়। ছাত্রশিবির সভাপতি ছাত্রদলের বিরুদ্ধে অভিযোগ তুলে বলেন, ছাত্রদল পরাজয়ের ভয়ে বারবার নির্বাচনকে বাধাগ্রস্ত করার হীন চক্রান্তে লিপ্ত রয়েছে। তারা প্রতিটি ছাত্র সংসদ নির্বাচন বন্ধের জন্য অপচেষ্টা চালিয়েছে। জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোটের কার্যক্রম প্রভাবমুক্ত রাখতে নির্বাচন কমিশন গত ১২ জানুয়ারি থেকে ১২ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত বিভিন্ন পেশাজীবী ও সংগঠনের নির্বাচন আয়োজন না করার নির্দেশ দিলেও শিক্ষার্থীদের দাবির মুখে পূর্বঘোষিত তারিখে শাকসু নির্বাচন অনুষ্ঠানের অনুমতি দেয় ইলেকশন কমিশন।
‘রোববার থেকে ছাত্রদলের নেতাকর্মীরা নির্বাচন বন্ধের দাবিতে ইসি কার্যালয়ের সামনে অবস্থান কর্মসূচি পালন করছে। অন্যদিকে এবং ষড়যন্ত্রমূলকভাবে গতকাল নির্বাচন স্থগিত চেয়ে হাইকোর্টে একটি রিট করা হয়েছে। এই রিটের শুনানিও এরইমধ্যে জানতে পেরেছি শেষ হয়েছে। সেই শুনানিতে অংশগ্রহণ করেছেন জাতীয়তাবাদী দলের বড়ো বড়ো আইনজীবী। অ্যাটর্নি জেনারেলের অফিস থেকেও এই নির্বাচন বন্ধে নাকি মব ক্রিয়েট করে নির্বাচন করার ব্যাপারে প্রেসার দেওয়া হয়েছে। এজন্য এটা বন্ধের ব্যাপারে তারাও সাবমিশন পেশ করেছে। এটা জুলাই পরবর্তী রাষ্ট্রের জন্য শিক্ষার্থীদের সঙ্গে কত বড়ো তামাশায় লিপ্ত হয়েছে। আমরা এ হীন চক্রান্তের তীব্র নিন্দা জানাচ্ছি।’
নুরুল ইসলাম সাদ্দাম বলেন, তেজগাঁও কলেজের শিক্ষার্থী সাকিব হত্যাকাণ্ড থেকে শুরু করে ক্যাম্পাসগুলোতে মাদক, সন্ত্রাস ও অপরাজনীতির কারণে তারা সাধারণ শিক্ষার্থীদের কাছে আজ প্রত্যাখ্যাত হয়েছে। নিজেদের পরাজয় ও গ্লানি থেকে শিক্ষা না নিয়ে তারা এখন পরিকল্পিতভাবে নির্বাচন বন্ধের ষড়যন্ত্রে প্রকাশ্যে লিপ্ত হয়েছে। শিবির সভাপতি বলেন, যে অবাধ সৃষ্ট নির্বাচনের দাবিতে দেশের সাধারণ মানুষ দীর্ঘ ১৭ বছর সংগ্রাম করেছে, ভোটাধিকার পুনঃপ্রতিষ্ঠায় আপসহীন নেত্রী বেগম খালেদা জিয়া আমৃত্যু লড়াই করে গেছেন। অথচ আজ ছাত্রদল সাধারণ শিক্ষার্থীদের ভোটাধিকার কেড়ে নেওয়ার জন্য নির্বাচন কমিশনের সামনে অবস্থান করছে। তাদের কর্মকাণ্ড দেখে প্রতীয়মান হচ্ছে যে তারা তারা মুখে গণতন্ত্রের বুলি আওড়ালেও কার্যত শিক্ষার্থীদের গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়াকে তারা তোয়াক্কা করে না। এটি তাদের দ্বিচারিতা এবং ছাত্রসমাজের প্রতি চরম উপহাসের শামিল। তারা মূলত শিক্ষার্থীদের ম্যান্ডেটকে ভয় পায় বলেই আজ নির্বাচন থেকে পালিয়ে যাওয়ার পথ খুঁজছে।
তিনি বলেন, বিস্ময়কর হলো সাম্প্রতিক অনুষ্ঠিত জকসু নির্বাচনে শিক্ষার্থীদের ভোটে নির্বাচিত একজন প্রতিনিধি আজ নির্বাচন বানচালের জন্য নির্বাচন কমিশনের সামনে আন্দোলনে অংশগ্রহণ করেছে। এটা দেখে বাংলাদেশের ছাত্রসমাজ বিশেষভাবে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা লজ্জিত, হতাশ ও হতবাক হয়েছে। শাকসু নির্বাচন বানচালের এই হীন নকশা নতুন কিছু নয় উল্লেখ করে শিবির সভাপতি বলেন, নানা নাটকীয়তা ও দফায় দফায় তফসিল পিছিয়ে সর্বশেষ ২০ জানুয়ারি চূড়ান্ত তারিখ নির্ধারণ করে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন। ঘোষিত তফসিল অনুযায়ী সব পক্ষ আনুষঙ্গিক সম্পূর্ণ প্রস্তুতি সম্পন্ন করেছে। পুরো ক্যাম্পাস জুড়ে এখন এক উৎসবমুখর পরিবেশ ও নির্বাচনী আমেজ বিরাজমান রয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে পেশি শক্তির জোরে কিংবা আদালতকে ব্যবহার করে নির্বাচন বানচালের অপচেষ্টা করা হলে শাবিপ্রবির ৯ হাজার শিক্ষার্থীসহ সচেতন ছাত্রসমাজ কোনোভাবেই তা মেনে নেবে না। এরইমধ্যে সাধারণ শিক্ষার্থীরা এই ষড়যন্ত্রকে ঘৃণাভরে প্রত্যাখ্যান করেছে।
নুরুল ইসলাম সাদ্দাম বলেন, আমাদের দাবি স্পষ্ট। শাকসু নির্বাচন নির্ধারিত তারিখেই অর্থাৎ অবশ্যই অবশ্যই আগামীকালই অনুষ্ঠিত হতে হবে। সুষ্ঠু, অবাধ ও নিরপেক্ষ নির্বাচন সম্পন্ন করতে হবে। কোনো ধরনের রাজনৈতিক চাপ হুমকি কিংবা পেশি শক্তির কাছে নতি স্বীকার করে নির্বাচন প্রক্রিয়াকে বিঘ্ন ঘটানো হলে তা কোনোভাবেই বরদাস্ত করা হবে না। তিনি বলেন, শিক্ষার্থীদের প্রাণের দাবি শাকসু নির্বাচন বন্ধের সিদ্ধান্ত হলে ছাত্রশিবির কঠোর কর্মসূচি দিতে বাধ্য হবে। দেশব্যাপী আমরা এই কর্মসূচি লাগাতার কর্মসূচি অব্যাহত রাখবো। সুস্থ রাজনৈতিক ধারার বাইরে গিয়ে পেশিশক্তি ব্যবহার করে মব ক্রিয়েট করে ছাত্রদল নির্বাচন কমিশনের সামনে অবরোধ কর্মসূচি ঘোষণা দিয়েছে উল্লেখ করে শিবির সভাপতি বলেন, তারা নির্বাচন কমিশন ঘেরাও করেছে। অথচ হাইকোর্টে সরকারের পক্ষ থেকে অ্যাটর্নি জেনারেলের অফিস থেকে সাবমিশন করা হচ্ছে। আমরা এগুলোর তীব্র নিন্দা প্রতিবাদ জানাই।
হুঁশিয়ারি দিয়ে তিনি বলেন, সরকার যদি এ ব্যাপারে কঠোর পদক্ষেপ না নেয়, অনমনীয় প্রভাব প্রদর্শন না করে তাহলে তাদের চরম মূল্য দিতে হবে। যে রাস্তায় ফ্যাসিবাদ হেঁটেছিল সেই রাস্তায় বিএনপি তার অঙ্গ সংগঠনগুলো এবং ছাত্রদল হাঁটছে উল্লেখ করে সাদ্দাম বলেন, আমরা এর তীব্র নিন্দা প্রতিবাদ জানাই। দুইটার সময় রিটের শুনানির ফল ঘোষণা হবে। আমরা আশা করি সরকারের বোধোদয় হবে। এই চক্রান্তে ফাঁদে পা দিয়ে সামনের জাতীয় নির্বাচনকে তারা প্রশ্নবিদ্ধ করবে না। একপাক্ষিক আচরণ তারা বন্ধ করবে। যদি না করে সারা দেশব্যাপী ইসলামী ছাত্রশিবির লাগাতার কর্মসূচি দিতে বাধ্য হবে সাধারণ শিক্ষার্থীদের নিয়ে।


























